সাত রং চা বা সাত কালার চা (Seven Color Tea) বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ও অনন্য উষ্ণ পানীয়, যা রংধনুর মতো বর্ণিল এবং প্রতিটি স্তরে আলাদা আলাদা স্বাদ রয়েছে। এই চা ‘রেইনবো-টি’ নামেও পরিচিত এবং দেখতে আকাশের রংধনুর মতোই বর্ণিল। একটি স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে পরিবেশিত এই চা দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় এবং স্বাদে অতুলনীয়। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।
আরও: বাংলাদেশের বৃহত্তম নদী কোনটি
রমেশ রাম গৌড় (উদ্ভাবক)
রমেশ রাম গৌড় হচ্ছেন সাত রং চায়ের উদ্ভাবক। তিনি মূলত ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার আটানিবাজারের অধিবাসী ছিলেন এবং সেখানে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অংশীদার ছিলেন। কিন্তু তার অংশীদার সব টাকা আত্মসাৎ করে ফেলায় তিনি ভাগ্য বদলের আশায় ২০০০ সালের মার্চ মাসে মাত্র দেড় হাজার টাকা নিয়ে পরিবার সহ শ্রীমঙ্গলে চলে আসেন।
প্রথমে তিনি শহরের নতুন বাজারে একটি দোকানে চাকরি নেন। ওই বছরের আগস্ট মাসে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন কাকিয়াছড়া চা বাগানে একটি চায়ের দোকান স্থাপন করেন। এরপর নিবিড় চিন্তা ও পরিশ্রমের ফলে ২০০২ সালে তিনি একই গ্লাসে দুই রঙের চা আবিষ্কার করে শ্রীমঙ্গলে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। ধীরে ধীরে তিনি চায়ের স্তর বাড়াতে থাকেন এবং অবশেষে সাত স্তরে সাত রঙের চা তৈরি করতে সক্ষম হন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি একই কাপে আট রং চা প্রস্তুতির কৌশলও উদ্ভাবন করেছেন।
সাত রং চায়ের ঠিকানা
সাত রং চা নীলকণ্ঠ টি কেবিনে পাওয়া যায়, যা শ্রীমঙ্গল, সিলেটে অবস্থিত একটি বিখ্যাত চায়ের দোকান। রমেশ রাম গৌড়ের দুইটি দোকান রয়েছে – শ্রীমঙ্গলের মণিপুরী অধ্যুষিত রামনগর এবং কালিঘাট রোডের ১৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ক্যান্টিনে। এছাড়াও সিলেট শহরের তামাবিল রোডে সুরমা গেটেও সাত রং চায়ের দোকান রয়েছে।
নীলকণ্ঠ টি কেবিনে বৈচিত্র্যময় চায়ের বাহার রয়েছে এবং ১ থেকে ৭ রঙের চা সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়। বর্তমানে সাত স্তরের চা ৭০ টাকা, ছয় স্তরের ৬০ টাকা, পাঁচ স্তরের ৫০ টাকা, চার স্তরের ৪০ টাকা, তিন স্তরের ৩০ টাকা, দুই স্তরের চা ২০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়াও হাই স্পেশাল চা, গ্রিন চা, আদা চা, লাল চা এবং লেবু চাও পাওয়া যায়।
আরও: শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ
সাত রং চায়ের বৈশিষ্ট্য
সাত রং চায়ের ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ এবং স্বাদ রয়েছে এবং রমেশ রাম গৌড় এক স্তরের উপর আরেক স্তর ঢেলে রংধনুর সাতটি আলাদা রং তৈরি করেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, একটি স্তর অপরটির সাথে মেশে না। চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও স্তরগুলো আলাদা থাকে।
সাত রং চায়ের উপরের স্তরটি দারুচিনি স্বাদের হয়ে থাকে এবং এর নিচের স্তরটি লেবু স্বাদ প্রদান করে। চতুর্থ স্তরে থাকে ঘনীভূত দুধের সাথে কালো চা, আর নিচের স্তরগুলোতে থাকে মিষ্টি, লবঙ্গসহ শরবত, সবুজ চা, দারুচিনি এবং গোপন মশলা। শরবত-মিষ্টি স্বাদ থেকে শুরু করে ঝাঁঝালো লবঙ্গ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের আলাদা স্বাদ রয়েছে।
সাত রং চায়ের জন্য চার ধরনের গাছ থেকে (তিন ধরনের কালো এবং এক ধরনের সবুজ) বিভিন্ন জাতের স্থানীয় উৎপন্ন চা পাতা সংগ্রহ করা হয় এবং ক্লোন টি ও বিভিন্ন ধরনের মসলার সংমিশ্রণে এই চা তৈরি করা হয়।
সাত রং চা তৈরির পদ্ধতি
যদিও রমেশ রাম গৌড় তার চা তৈরির সম্পূর্ণ গোপন প্রক্রিয়া কখনো পুরোপুরি প্রকাশ করেননি, তবুও মূল পদ্ধতি এখন অনেকেই জানেন। এটি মূলত চা পাতা ও চিনির ঘনত্বের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়। ঘরে বসে সাত রং চা তৈরি করতে চাইলে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন:
উপকরণ:
- চিনি
- পানি
- চা পাতা
- কনডেন্স মিল্ক
- বিভিন্ন মসলা (দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ)
- সবুজ চা
- লেবু
প্রস্তুত প্রণালী:
- প্রথমে ১ টেবিল চামচ চিনির সাথে ২ টেবিল চামচ পানি মিশিয়ে সিরা তৈরি করুন।
- পরিমাণমতো পানি ও চা পাতা চুলায় জ্বাল দিয়ে লিকার (ঘন চা) তৈরি করে নিন।
- ১ টেবিল চামচ লিকার ও ১ চামচ সিরা মিশিয়ে রাখুন।
- ২ টেবিল চামচ কনডেন্স মিল্কের সাথে ১ টেবিল চামচ লিকার মিশিয়ে নিতে হবে।
- একটি স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে প্রথমে প্লেইন সিরা ঢেলে নিন।
- ২০ সেকেন্ড পরে সিরা মেলানো লিকার দিন।
- এর ৩০ সেকেন্ড পরে কনডেন্স মিল্কের মিশ্রণ দিতে হবে।
- তার ১ মিনিট পর বাকি লিকার গরম করে কাপের ধার ঘেঁষে খুব আস্তে আস্তে ঢালতে হবে।
- আরও ১ মিনিট পর পরপর কনডেন্স মিল্কের মিশ্রণ ও লিকার আস্তে আস্তে ঢালতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস:
- প্রতিটি স্তরের চা আলাদা করে তৈরি করুন যাতে ঘনত্ব ও রং আলাদা থাকে
- নিচের স্তর সবচেয়ে ভারী হবে, উপরেরটা সবচেয়ে হালকা
- প্রতিটি চা হালকা করে ঠান্ডা করলে স্তরগুলো ভালো থাকবে
- একটি চামচ বা স্ট্র গ্লাসের পাশে রেখে খুব ধীরে ধীরে ঢালুন যাতে মিশে না যায়
আরও: মাধবপুর লেক ভ্রমণ
জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতি
চা প্রেমীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসেন সাত রং চায়ের স্বাদ নিতে। শ্রীমঙ্গলে যারা বেড়াতে আসেন তারা সাত রঙের চায়ের স্বাদ নিতে ভোলেন না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শ্রীমঙ্গলে গিয়ে রমেশ রাম গৌড়ের বিখ্যাত চা পান করে এসেছেন।
ঢাকায় নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত আহমেদ বিন মোহাম্মেদ আল-দিহাইমি শ্রীমঙ্গল ভ্রমণকালে সাত রং চায়ের স্বাদ নেন এবং রমেশ রাম গৌড় তার কাছ থেকে এক কাপ সাত রং চায়ের জন্য সাত হাজার টাকা উপহার পান। রমেশ রাম গৌড়ের চায়ের দোকান সমূহ থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। এটি শুধুমাত্র একটি পানীয় নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ উৎসব-আমেজের দেশ এবং কোনো ধর্মীয় উৎসব বা ছুটির দিনে সাত রং চায়ের নাম ও খ্যাতির জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকেরা এসে ভিড় জমায়। বিশেষত ঈদের সময় সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে সাত রং চায়ের দোকানেও পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
চায়ের রাজধানী
শ্রীমঙ্গল সিলেটের একটি শহর যা পাহাড়ি ঢালুতে মাইলের পর মাইল জুড়ে চা বাগানের জন্য বিখ্যাত এবং এজন্য একে বাংলাদেশের চা রাজধানী বলা হয়। পাহাড় ও ঘন জঙ্গল থাকায় শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশের সবথেকে বেশি বৃষ্টিপাত হয় এবং শীত পড়ে, যা চা উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে ৩৮টি চা বাগান রয়েছে।
সিলেট বিভাগের চারটি জেলার মধ্যে তিনটি (মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সিলেট) জেলাই চা উৎপাদনকারী জেলা এবং শুধু সিলেটেই রয়েছে ১৫০টিরও অধিক চা বাগান। আকার ও উৎপাদনের ভিত্তিতে এদের মধ্যে তিনটি পৃথিবীর সবথেকে বড় চা বাগান।
বিভিন্ন জাতের চা পাতা ও এর সহজলভ্যতার জন্য বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) এখানে গড়ে তোলা হয়েছে, যা বাংলাদেশ চা বোর্ডের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান।
চায়ের গোপন রহস্য
যদিও বর্তমানে অন্যান্য চা প্রস্তুতকারক ও দোকান সমূহ বহুস্তর চা প্রস্তুত করছে, রমেশ রাম গৌড় একসময় ভাবতেন যে ‘চায়ের গোপন প্রস্তুতপ্রণালী’ কেউ নকল করতে পারবে না এবং তিনি কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে গোপন প্রক্রিয়াটি কাউকে বলেননি। তবে মূল কৌশল হলো চায়ের ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা। বিভিন্ন ঘনত্বের চা একের পর এক স্তর সাজিয়ে এই অসাধারণ পানীয়টি তৈরি করা হয়।
আরও: টাঙ্গুয়ার হাওর
সিলেট ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন? তাহলে শ্রীমঙ্গলের নীলকণ্ঠ টি কেবিনে সাত রং চায়ের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। এই অভিজ্ঞতা আপনার ভ্রমণকে করে তুলবে আরও স্মরণীয় ও বিশেষ। সাত রং চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি অভিজ্ঞতা যা বাংলাদেশের চা সংস্কৃতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ফেসবুক: GoArif
