• সার্চ
  • সার্চ
ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif

ভাসু বিহার ভ্রমণ – শিবগঞ্জ, বগুড়া

ভাসু বিহার ভ্রমণ – শিবগঞ্জ উপজেলার বগুড়া জেলায় অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যা স্থানীয়দের কাছে ভাসু বিহার বা, নরপতির ধাপ নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে: Vasu Vihara বা, Vasu Vihar বলা হয়ে থাকে।

বগুড়া ভ্রমণের আজকে আপনাকে আমি খেরুয়া মসজিদ থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত গুপ্তযুগের দুটি আয়তক্ষেত্রাকার বৌদ্ধবিহার এবং একটি প্রায় ক্রুশাকৃতি মন্দির ভ্রমণে নিয়ে যাব।

চলুন শুরু করা যাক…

পরিচ্ছেদসমূহ

ভাসু বিহার ভ্রমণ


ভাসু বিহার ভ্রমণে প্রথমে চলুন এই নরপতির ধাপ নামে পরিচিত প্রাচীন প্রত্ন নিদর্শন সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যাক।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif
ভাসু বিহার ভ্রমণ – শিবগঞ্জ, বগুড়া

ভাসু বিহার ভ্রমণ তথ্য

ভ্রমণ স্থানভাসু বিহার
অবস্থানশিবগঞ্জ, বগুড়া
নির্মিত৮ম শতক
স্থাপত্যশৈলীগুপ্ত, পাল
ধরনপ্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
স্থানীয় নামনরপতির ধাপ
আবিষ্কৃত হয়১৯৭৩-৭৪ সাল
মহাস্থানগড় থেকে দূরত্ব৬ কিলোমিটার (প্রায়)
বগুড়া থেকে দূরত্ব২০ কিলোমিটার (প্রায়)
ঢাকা থেকে দূরত্ব২৫২ কিলোমিটার (প্রায়)

ইতিহাস

১৯৭৩-৭৪ সালে খনন করে নরপতির ধাপ আবিষ্কৃত হওয়ার পর ধারণা করা হয় এটি একটি বৌদ্ধ সংঘারামের ধ্বংসাবশেষ। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়ার এই স্থানে এসেছিলেন। তখন হিউয়েন সাঙ তার ভ্রমণ বিবরণীতে তিনি এটাকে ‘পো-শি-পো’ বা বিশ্ববিহার নামে উল্লেখ করেছিলেন।

অনেকের ধারনা খুব সম্ভবত এটি বৌদ্ধদের ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মানে এখানে বৌদ্ধরা তাদের গুরুদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করতেন।

মজার বিষয় হচ্ছে, ব্রিটিশ আমলে ভাসুবিহারকে স্থানীয়রা ‘ভুশ্বুবিহার’ নামে ডাকত। আর বর্তমানে ডাকে নরপতির ধাপ নামে!

অবকাঠামো

ভাসু বিহার প্রত্নস্থল স্থানীয়দের কাছে নরপতির ধাপ নামে পরিচিত এ প্রত্নস্থলে টি ১৯৭৩-৭৪ সালে উৎখননের কাজ শুরু হয় এবং পরবর্তী ২ মৌসুমে তা অব্যাহত থাকে।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif

উৎখননের ফলে ২টি মাধ্যম আকৃতির সংঘারাম ও ১টি মন্দিরের স্থাপত্যিক কাঠামোসহ প্রচুর পরিমাণ প্রত্নবস্তু উন্মোচিত হয়। অপেক্ষাকৃত ছোট সংঘারামটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৪৯ মিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে ৪৬ মিটার।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif

এর ৪ বাহুতে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য ২৬টি কক্ষ ও কক্ষগুলির সামনে চতুর পাশে ঘোরানো বারান্দা এবং পূর্ব বাহুর কেন্দ্রস্থলে প্রবেশপথ রয়েছে।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif
মনির হোসেন

অপেক্ষাকৃত বড় বিহারের ভূমি পরিকল্পনা ও স্থাপত্য কৌশল প্রথমটির অনুরূপ। এর পরিমাণ পূর্ব-পশ্চিমে ৫৬ মিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ৪৯ মিটার। এর ৪ বাহুতে ৩০টি ভিক্ষুকক্ষ এবং দক্ষিণ বাহুর কেন্দ্রস্থলে প্রবেশপথ অবস্থিত।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif
ভাসু বিহার

বিহারের অদূরে উত্তরমুখী মন্দিরটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৩৮ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৭ মিটার।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif
ভাসু বিহার

উৎখননের প্রাপ্ত নিদর্শন

মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি বর্গাকার মন্ডপ। এর চতুর্দিকে রয়েছে ধাপে ধাপে উন্নীত প্রদক্ষিণ পথ। উৎখননের প্রাপ্ত প্রায় ৮০০ প্রত্নবস্তুর মধ্যে ব্রোঞ্জের ক্ষুদ্রাকৃতির মূর্তি, পোড়ামাটির ফলক এবং পোড়ামাটির সীল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif

এছাড়া সংগৃহীত হয়েছে মূল্যবান পাথরের গুটিকা, লোহার পেরেক, মাটির গুটিকা, অলংকৃত ইট, মাটির প্রদীপ ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি এবং প্রচুর মৃৎপাত্রের টুকরা।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif

এ সমস্ত বিভিন্ন ধরনের প্রত্নবস্তু থেকে পাল শাসনের শেষ যুগের (দশম/একাদশ শতক) শিল্পকর্ম ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিচয় পাওয়া যায়।

ভাসু বিহার ভ্রমণ

বগুড়া ভ্রমণের ২য় দিকে রয়েছি আমি আরিফ হোসেন এবং আমার সাথে ভ্রমণে রয়েছে মোহাইমিনুল ইসলাম, মনির হোসেন এবং কর্নেল জসিম।

আমরা সি এন জি করে বগুড়া সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত শিবগঞ্জ উপজেলার ভাসু বিহারে চলে আসলাম। এটা বিহার ইউনিয়নের ভাসুবিহার গ্রামে অবস্থিত।

শিবগঞ্জ পৌরসভা, বগুড়া - GoArif
শিবগঞ্জ পৌরসভা, বগুড়া – বিহার যাবার পথে।

গ্রামের অলিগলি পিচঢালাই রাস্তা দিয়ে সি এন জি যোগে চলে আসলাম নরপতির ধাপ । এখানে উল্লেখ্য যে, আমরা সারাদিনের জন্য ১০০০ টাকায় সি এন জি রিজার্ভ নিয়েছিলাম। আপনার ক্ষেত্রে ভাড়া কম বেশী হতে পারে। আপনি অবশ্যই দরদাম করে নিবেন।

আমরা নরপতির ধাপ আসার পথে বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্য করেছি। এখানের মানুষ শূকর পালে! রাস্তার পাশে হঠাৎ হঠাৎ বড়-ছোট শুকরের পাল দেখতে পেয়েছি আমরা।

এছাড়া এখানে টিন, ছোন এবং ইটের ঘরের পাশাপাশি প্রচুর মাটির ঘর রয়েছে। তবে এখানের মানুষের জীবন যাপনের মান ততটা উন্নত নয়।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় কলা হালি অথবা ডজনে বিক্রি হলেও এখানে কলা বিক্রি হয় কেজিতে! যাক, যে বিষয় নিয়ে বিস্তারিত লেখা পাবেন এখানে: ভ্রমণ কাহিনী

ভাসু বিহারে কি দেখলাম

নরপতির ধাপ এর ভিতরে সিএনজি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে তাই আমরা গেইট দিয়ে সিএনজি নিয়ে ভিতরে চলে চলে আসলাম।

বিশাল এলাকা জুড়ে নরপতির ধাপ অবস্থিত। এখানে আসার পর প্রথমে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বিশাল এক বট গাছ।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif
বট গাছ

তার পাশেই রয়েছে একটি সাইন বোর্ড। যেখানে ভাসু বিহার সম্পর্কে বাংলা এবং ইংরেজিতে সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা দেয়া আছে।

ভাসু বিহারে খেজুর গাছ এবং সাইনবোর্ড -GoArif
খেজুর গাছ এবং সাইনবোর্ড।

সবুজ ঘাসের আস্তরিত উচু-নিচু পুরো নরপতির ধাপ। এখানে গাছের ভিতরে সবচেয়ে বেশি রয়েছে খেজুর গাছ। সম্পূর্ণ জায়গাটা নিরিবিলি। দর্শনার্থী খুব একটা নেই।

ভাসু বিহার ভ্রমণ - শিবগঞ্জ, বগুড়া - GoArif

ভাসু বিহার সংস্কার

১৯৭৩-৭৪ সালে আবিষ্কৃত হয়ে এই পর্যন্ত অনেকবার নরপতির ধাপ সংস্কার হয়েছে। আমরা ভ্রমণে গিয়েও নরপতির ধাপ সংস্কার কাজ চলছে দেখতে পাই।

ভাসু বিহার সংস্কার - GoArif
সংস্কার কাজ চলছে।

ভ্রমণ গাইড

নরপতির ধাপ মহাস্থানগড় থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার, বগুড়া থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং ঢাকা থেকে প্রায় ২৫২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।

ঢাকা থেকে বাসে যাবেন যেভাবে

ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার জন্য অনেগুলো পরিবহন রয়েছে। রাজধানী ঢাকার গাবতলী, মহাখালী, শ্যামলী, আবদুল্লাহপুর ও কল্যাণপুর থেকে প্রতিদিন বগুড়ার উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে বাস যোগে যেতে উল্লেখযোগ্য পরিবহন গুলো হলঃ

  • হানিফ এন্টারপ্রাইজ
  • শ্যামলী পরিবহন
  • এনা
  • এস আর ট্রাভেলস
  • মানিক
  • ডিপজল
  • আল হামরা
  • নাবিল
  • শাহ ফতে আলি
  • টি আর ট্রাভেলস

হুন্দাই এসি বাস সার্ভিস: তবে, এদের ভিতরে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এস আর ট্রাভেলস, নাবিল এবং মানিক পরিবহন এর ৩ সিট হুন্দাই এসি বাস সার্ভিস রয়েছে।

বাস টিকিট মূল্য: ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার বাস টিকিট সর্বনিম্ন ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা পর্যন্ত।

ঢাকা থেকে ট্রেন ভ্রমণ

ঢাকা থেকে ২টি ট্রেন সার্ভিস রয়েছে। ট্রেন ২টি হলঃ লালমনি এবং রংপুর এক্সপ্রেস। ২টি ট্রেনই বগুড়া হয়ে যাতায়াত করে।

ঢাকা থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টায় রংপুর এক্সপ্রেস এবং রাত ১০ টা ১০ মিনিটে লালমনি এক্সপ্রেস কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে যায়।

তবে, রংপুর এবং লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেন যথাক্রমে রবিবার এবং শুক্রবার বন্ধ থাকে।

বগুড়া থেকে ভ্রমণ

বগুড়া থেকে আপনি সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে ভাসু বিহার চলে আসতে পারেন। ভাড়া ২০০-৩০০ টাকার মত নিবে। তবে, ভাড়া কম বেশি হতে পারে। রিজার্ভ করার আগে অবশ্যই দরদাম করে নিবেন।

কোথায় থাকবেন

ভাসু বিহার ভ্রমণে থাকার জন্য হোটেল গুলো দেখুন এখানে: বগুড়া হোটেল

ভাসু বিহার ভ্রমণ টিপস

শিবগঞ্জ উপজেলার বগুড়া জেলার নরপতির ধাপ দর্শনার্থীদের জন্য চমৎকার একটি জায়গা। কিন্তু এখানে ভ্রমণের সময় কিছু বিষয় আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে।

  1. নরপতির ধাপ বগুড়া জেলা সদর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় সাথে করে অবশ্যই প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মেডিসিন নিয়ে নিবেন।
  2. ভাসু বিহার খুবই নিরিবিলি স্থান অর্থাৎ এখানে খুব কম মানুষ ভ্রমণে আসে। তাই এখানে একা ভ্রমণে আসা ঠিক নয়।
  3. সিএনজি ভাড়া করার সময় বলে নিবেন কতক্ষন আপনি তাকে নিয়ে ঘুরবেন।
  4. একজন ভ্রমণ কারীর সাথে ক্যামেরা থেকে শুরু করে মোবাইল, ল্যাপটপ, ড্রোন ইত্যাদি থাকে। তাই নিরিবিলি স্থানে ভ্রমণ করার সময় সদা সতর্ক থাকা উচিত। বলাতো যায়না কখন বিপদ ঘটে যায়। একাকী ভ্রমণে টিপস গুলো দেখেনিতে পারেন।
  5. ভ্রমণে পান করার জন্য সাথে ফ্রেশ পানি নিয়ে নিবেন।
  6. খুব সকালে এবং বিকেলের পর এখানে ভ্রমণ না করাই ভালো।
  7. বর্ষার সময় এখানে ভ্রমণ না করাই উত্তম।

ভাসু বিহার ম্যাপ


আমার ইনস্টাগ্রাম: GoArif

GoArif.com ওয়েবসাইটের কোথাও কোন ভুল বা অসংগতি আপনার দৃষ্টিগোচর হলে তা অনুগ্রহ করে আমাকে অবহিত করুন, যেন আমি দ্রুত সংশোধন করতে পারি।
আরিফ হোসেন

আমি একজন ভ্রমণ পিপাসু। ভ্রমণ করতে আমার খুবই ভালো লাগে। তাইতো সময় পেলে ভ্রমণে ছুটে যাই। কোন ভ্রমণই আমার শেষ হয়ে শেষ হয় না। বারংবার আমার সেই স্থানে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। কারন, আমি যে প্রকৃতি ভালবাসি।

সব পোস্ট দেখুন

মন্তব্য করুণ