বাংলার তাজমহল (Banglar Tajmahal) বা তাজমহল বাংলাদেশ, ভারতের আগ্রায় অবস্থিত পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম একটি নিদর্শন তাজমহলের আদলেই বানানো। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে যে অমর প্রেমের স্মারক নির্মাণ করেছিলেন, তা আজও বিশ্বের মানুষকে মুগ্ধ করে। কিন্তু আপনি কি জানেন, বাংলাদেশেও একটি তাজমহল রয়েছে? হ্যাঁ, নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার পেরাব গ্রামে নির্মিত এই অপূর্ব স্থাপত্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলার তাজমহল বা দ্বিতীয় তাজমহল নামে পরিচিত।
ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই তাজমহল একদিনের ভ্রমণের জন্য অসাধারণ একটি গন্তব্য। অনেকেই হয়তো স্বপ্ন দেখেন আগ্রার তাজমহল দেখার, কিন্তু সময়, অর্থ বা অন্যান্য কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়ে ওঠে না সবার। বাংলার তাজমহল সেই স্বপ্নপূরণের একটি সুযোগ করে দিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য। মূল তাজমহলের আদলে নির্মিত এই স্থাপত্যটি দেখলে মনে হবে যেন সত্যিই আগ্রার তাজমহলে এসেছেন।
প্রায় ১৮ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই কমপ্লেক্সে শুধু তাজমহলই নয়, রয়েছে আরও অনেক আকর্ষণ। মিসরের পিরামিডের প্রতিরূপ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য, ফিল্ম স্টুডিও, রেস্তোরাঁ এবং আরও অনেক কিছু এখানে দেখার ও উপভোগ করার আছে। সবুজ ঘাসের গালিচা, রঙিন ফুলের বাগান, পানির ফোয়ারা এবং হাজারো পাখির কলকাকলি মিলে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এখানে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ স্থান।
স্থাপত্য ও সৌন্দর্য
বাংলার তাজমহল নির্মাণে আগ্রার মূল তাজমহলের সাথে সর্বোচ্চ সাদৃশ্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তাজমহলের প্রধান ভবনটি দামি স্বচ্ছ পাথর দিয়ে মোড়ানো এবং সম্পূর্ণ টাইলস করা। মূল তাজমহলের মতোই এর চার কোণে রয়েছে চারটি বিশাল মিনার যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন সত্যিকারের তাজমহল।
মূল ভবনের সামনে রয়েছে সুন্দর পানির ফোয়ারা, যা চারপাশের প্রতিফলন তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপহার দেয়। চারদিকে সুসজ্জিত ফুলের বাগান এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য বসার ব্যবস্থা রয়েছে। হাজার হাজার বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলি পরিবেশকে করে তোলে আরও মনোমুগ্ধকর।
মূল ভবনের অভ্যন্তরে আহসান উল্লাহ মনি এবং তার স্ত্রী রাজিয়ার কবরের স্থান সংরক্ষিত রয়েছে। মূল তাজমহলের মতোই এটি তাদের প্রেমের এক অমর নিদর্শন।
আরও: গোয়ালদি মসজিদ
কি আছে বাংলার তাজমহলে
- রাজমনি ফিল্ম সিটি স্টুডিও
- রাজমনি ফিল্ম সিটি রেস্তোরাঁ
- মিসরের পিরামিডের প্রতিরূপ
- স্মৃতি ভাস্কর্য
- সিনেমা হল ও সেমিনার কক্ষ
- হস্তশিল্প ও কেনাকাটা
আরও: পানাম নগর
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাংলার তাজমহলে যাওয়ার বেশ কয়েকটি উপায় রয়েছে:
মহাখালী/যাত্রাবাড়ী থেকে
ঢাকার মহাখালী বা যাত্রাবাড়ী থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে কুমিল্লা, দাউদকান্দি অথবা সোনারগাঁগামী যেকোনো বাসে চড়ুন। মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে নামুন (ভাড়া প্রায় ১৫-২০ টাকা)। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় জনপ্রতি ২৫-৩০ টাকা ভাড়ায় তাজমহলে যেতে পারবেন।
ভুলতা রোড দিয়ে
৩০০ ফিট রাস্তা দিয়ে ভুলতা আসুন। সেখান থেকে ৮০-১০০ টাকায় অটোরিকশা রিজার্ভ করে সরাসরি তাজমহলে যেতে পারবেন।
সিলেট রোড দিয়ে
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে ভৈরব, নরসিংদী বা কিশোরগঞ্জগামী বাসে গিয়ে বরপা বাসস্ট্যান্ডে নেমে সিএনজিতে করে তাজমহলে যেতে পারবেন।
সোনারগাঁও উপজেলা থেকে
সোনারগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গেইট থেকে সিএনজি বা রিকশায় মহজমপুর বাজার হয়ে সরাসরি তাজমহলে যাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে ৫০-৭০ টাকা।
এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে গুগল ম্যাপসে “Banglar Tajmahal” সার্চ করে সহজেই পৌঁছাতে পারবেন।
সময়সূচী ও টিকেট মূল্য
খোলার সময়: বাংলার তাজমহল প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সপ্তাহের সাতদিনই তাজমহল খোলা, কোনো বন্ধের দিন নেই।
প্রবেশ টিকেট: জনপ্রতি প্রবেশ টিকেটের মূল্য ২০০ টাকা। এই একই টিকেটে তাজমহল ও পিরামিড দুটোই দেখতে পারবেন। শুধুমাত্র তাজমহল বা শুধু পিরামিড আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
বাংলার তাজমহল দেখতে বেশি সময় লাগে না। তাই একই দিনে আশেপাশের আরও কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসতে পারেন:
- পানাম নগর
- সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর
- জিন্দাপার্ক
- মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি
- মায়াদ্বীপ
ভ্রমণের সেরা সময়
বছরের যেকোনো সময় বাংলার তাজমহলে যাওয়া যায়। তবে শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। এ সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং ভ্রমণ উপভোগ্য হয়।
বর্ষাকালেও (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) এখানে যাওয়া যায়, তবে বৃষ্টির কারণে কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। গ্রীষ্মকালে (মার্চ থেকে মে) খুব গরম পড়ে, তাই সকালে বা বিকেলে যাওয়াই ভালো।
ভ্রমণ টিপস
- ভোরে ভিড় কম থাকে এবং ছবি তোলার জন্য আলো ভালো পাবেন।
- এই সুন্দর স্থাপত্যের অনেক ছবি তুলতে চাইবেন। ভালো ক্যামেরা বা স্মার্টফোন সঙ্গে রাখুন।
- গরমের সময় পানির বোতল এবং হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন।
- হাঁটাহাঁটির জন্য আরামদায়ক জুতা এবং পোশাক পরুন।
- পরিবার ও শিশুদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত জায়গা।
- পর্যটন স্থানের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না।
- গরমের দিনে দুপুর এড়িয়ে সকালে বা বিকেলে যাওয়াই ভালো।
- স্থানীয় গাইড রাখলে তাজমহল ও এলাকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
- স্থাপত্যের কোনো ক্ষতি করবেন না।
কোথায় খাবেন
বাংলার তাজমহল কমপ্লেক্সেই রাজমনি ফিল্ম সিটি রেস্তোরাঁয় ভালো মানের খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া আশেপাশে বেশ কিছু হোটেল ও খাবারের দোকান রয়েছে। সোনারগাঁওয়ে এসে ঐতিহ্যবাহী বাংলা খাবার খেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
যেহেতু বাংলার তাজমহল ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে, তাই একদিনেই ঘুরে আসা সম্ভব। তবে চাইলে সোনারগাঁওয়ে কিছু রিসোর্টে থাকতে পারেন। নারায়ণগঞ্জ শহরেও বেশ কিছু হোটেল আছে।
আরও তথ্যের জন্য স্থানীয় পর্যটন কর্তৃপক্ষ বা সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
তাজমহল নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বাংলার তাজমহল কোথায় অবস্থিত?
বাংলার তাজমহল নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার পেরাব গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার।
বাংলার তাজমহলে প্রবেশ টিকেটের দাম কত?
জনপ্রতি প্রবেশ টিকেটের মূল্য ২০০ টাকা। এই একই টিকেটে তাজমহল ও পিরামিড দুটোই দেখতে পারবেন।
বাংলার তাজমহল সপ্তাহের কোন দিন খোলা থাকে?
বাংলার তাজমহল সপ্তাহের সাতদিনই খোলা থাকে। কোনো বন্ধের দিন নেই। খোলার সময় সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।
ঢাকা থেকে বাংলার তাজমহলে যেতে কতক্ষণ সময় লাগে?
যানবাহন ও ট্রাফিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ঢাকা থেকে বাংলার তাজমহলে যেতে সাধারণত ১-২ ঘণ্টা সময় লাগে।
তাজমহলে কি ছবি তোলা যায়?
হ্যাঁ, বাংলার তাজমহলে ছবি তোলা সম্পূর্ণ অনুমোদিত। ক্যামেরা বা স্মার্টফোন নিয়ে নির্দ্বিধায় ছবি তুলতে পারবেন।
তাজমহলে কি পার্কিং সুবিধা আছে?
হ্যাঁ, বাংলার তাজমহল কমপ্লেক্সে গাড়ি পার্কিং এর সুবিধা রয়েছে।
বাংলার তাজমহলে কি শুধু তাজমহল আছে, নাকি আরও কিছু দেখার আছে?
বাংলার তাজমহল ছাড়াও এখানে মিসরের পিরামিডের প্রতিরূপ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য, ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ভাস্কর্য, সিনেমা হল, ফিল্ম স্টুডিও এবং হস্তশিল্পের দোকান রয়েছে।
বাংলার তাজমহল কি আগ্রায় অবস্থিত তাজমহলের মতো দেখতে?
হ্যাঁ, বাংলার তাজমহল নির্মাণে মূল আগ্রায় অবস্থিত তাজমহলের সাথে সর্বোচ্চ সাদৃশ্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আকারে এটি মূল তাজমহলের চেয়ে ছোট।
বাংলার তাজমহল কে নির্মাণ করেছেন এবং কেন?
নারায়ণগঞ্জের শিল্পপতি ও চলচ্চিত্রকার আহসান উল্লাহ মনি ২০০৩-২০০৮ সালের মধ্যে এটি নির্মাণ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যারা ভারতে গিয়ে মূল তাজমহল দেখতে পারেন না, তারা যেন নিজ দেশে থেকেই তাজমহলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।
ফেসবুক: GoArif
