বিড়াল ও বুদ্ধিমান ইঁদুর - goArif

বিড়াল ও বুদ্ধিমান ইঁদুর এর গল্প

বিড়াল ও বুদ্ধিমান ইঁদুর এর গল্প । অনেক দিন আগের কথা। আফ্রিকার সোমালি রাজ্যে একবার বিড়ালের খুব দুরবস্থা চলছিল। দিনের পর দিন ইঁদুর ধরে খেতে না পেয়ে তারা যেমন মনোকষ্টে ভুগছিল, তেমনি রোগা ও হয়ে যাচ্ছিল। আর ওদিকে ইঁদুরগুলো গাদা গাদা শস্যকণা খেয়ে হয়ে উঠছিল নধর আর হৃষ্টপুষ্ট।

এই ভাবেই ইঁদুর না খেয়ে বিড়ালরা আর কতদিন থাকতে পারে! এর একটা বিহিত করতে তারা সব বিড়ালদের এক মিটিং ডাকলো – উদ্দেশ্য ছিল সবকটাই ইঁদুরকে একসঙ্গে ধরে খাবার একটা ফন্দি আঁটা। মিটিংয়ে বিড়ালদের রাজাই সভাপতি হলো। সব বিড়াল এসে হাজির হলে বিড়ালদের রাজা তার পিছনের দু পায়ে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করলো, বলল, হে মার্জার ভাই ও বোনেরা তোমরা আমার শুভেচ্ছা গ্রহন করো। আজ আমরা এখানে কেন এসেছি তোমরা সকলেই জানো। ইঁদুরদের বেশ সুদিন চলছে তারা খুব বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। ধরা যেন কেবল তাদের দিকে মুখ তুলে চেয়েছে। তাদের সংখ্যা ও যেমন বেড়েছে গতরও তেমনি হয়েছে নধর।। এদিকে আমাদের চলছে দুর্ভিক্ষ, – ইঁদুর না খেতে পেরে আমরা দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছি, আর দুর্বল হয়ে পড়ছি। এখন আমাদের ভেবেচিন্তে এমন এক উপায় বের করতে হবে যাতে করে আমরা ঐসব ইঁদুরদের সহজে ধরে তাদের সরস মাংস খেয়ে আমরা মোটা হতে পারি। (ইঁদুরের সরস মাংসের কথা শুনে সব বিড়ালের নোলায় নিশ্চয়ই জল এসেছিল, এমনকি রাজামশাইয়েরও। সে জিভটা একটু চেটে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল)। বলল, তোমরাই বল এ বিষয়ে কি করে এগোনো যায়?

বিড়াল ও বুদ্ধিমান ইঁদুর (1) - goArif
বিড়াল এর আলোচনা সভা

তখন এক বৃদ্ধ বিজ্ঞ বিড়াল দাঁড়িয়ে উঠে রাজাকে নমস্কার করে বলল আমাদের রাজামশাই দীর্ঘজীবী হোন। ইঁদুরদের ধরার জন্য আমি একটা উপায় ভেবেছি। বলি কি, আমাদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার নাম করে কৌশলে এসব ইঁদুরদের এক সভায় ডেকে আনা হোক। এমন একটা মাঠে সভা ডাকতে হবে যেখানে কোন গাছপালা নেই। তাহলেই ইদুররা সভাতে এলে আমরা তাদের অনায়াসে ধরে ফেলতে পারব। তারা আমাদের হাত থেকে পালাতে পারবে না।

আরো পড়ুনঃ যখন আমি বুড়ো হয়ে যাবো, একেবারে থুত্থুরে বুড়ো 😢

এই বৃদ্ধ বিজ্ঞ বিড়ালের কথা সকলেরই মনঃপুত হল; সকলেই খুব উৎসাহের সঙ্গে বৃদ্ধ বিড়ালের প্রশংসা করল। তখন বিড়ালদের রাজা আবার কিছু বলতে উঠলো, বলল, হে বৃদ্ধ বিজ্ঞ মার্জার আপনি দীর্ঘজীবী হোন আপনার বুদ্ধি ও দীর্ঘজীবী হোক। আপনি খুব বিজ্ঞের মতোই উপদেশ দিয়েছেন। আমি আজই ইঁদুরের রাজার কাছে গিয়ে আমাদের এই শান্তি স্থাপনের প্রস্তাব জানাবো এবং জাতে সব ইঁদুররা সভায় আসে তার চেষ্টা করব। হে ভাই ও বোনেরা তোমরা সেই শুভ সংবাদের জন্য অপেক্ষা কর।

সব বিড়াল তখন জয়ধ্বনি করে উঠল ‘আমাদের রাজা দীর্ঘজীবী হন’। মিটিং সেখানেই শেষ হলো।

সেই কথা মত বিড়ালদের রাজা ইঁদুরদের রাজার কাছে গেল। কিন্তু ইঁদুর তো আর বিড়ালদের বিশ্বাস করে না, কাজেই দূরে বসেই দুই রাজার মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলল।

মার্জাররাজ বলল, হে মূষিককুলের অধিপতি, হে স্বাধীনতার প্রতীক, হে জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ আপনি দীর্ঘজীবী হন! আপনার মঙ্গল হোক! আপনার সব কুশল তো?

তখন গর্ত থেকে মূষিকরাজ বেরিয়ে এসে বললো, ‘হে মার্জারকুলের অধিপতি, আপনি বৃক্ষের মত শীতল ছায়ায় সবকিছু আচ্ছাদিত করে রেখেছেন! হে পৃথিবীর বিচারকর্তা, হে ভ্রাতা আপনার মঙ্গল হোক! আপনার সব কুশল তো?

দুই রাজার মধ্যে এভাবে কুশলবার্তা বিনিময় এর পালা শেষ হলে, মার্জাররাজ কোন ভনিতা না করে সোজাসুজি কথাটা পেড়ে বসল, বলল, আমি শান্তি স্থাপনের জন্য এসেছি। আমার প্রজাদের পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে শান্তির প্রস্তাব এনেছি। আপনি জানেন এই বিড়াল আর ইঁদুরের মধ্যে যুগ যুগ ধরে শত্রুতা চলে আসছে; আর তাতে আপনাদেরও ক্ষতি হচ্ছে, আমাদের ও ক্ষতি হচ্ছে। আপনাদের ক্রমাগত মেরে খাওয়ার আমাদের যে বদ অভ্যাস তাতে আপনাদের সংখ্যা ক্রমেই কমে চলেছে। আর দেখুন, আপনাদের ধরতে আমাদের কত কষ্ট! তার উপর ঝোপঝাড়ের মধ্যে আপনাদের পিছনে ছুটে আমাদের চোখে কাটা বিধে যাচ্ছে। আমরা সবাই প্রায় অন্ধ হয়ে গেছি। সেজন্য আমরা নিজেরাই ঠিক করেছি যে আপনাদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করাই মঙ্গল। দিরিন্দিরের মাঠে সরকারিভাবে আমাদের দুই দলের এক সভা ডাকছি। আমরা সেখানে শান্তির শপথ নেব; আমরা এখন থেকে বন্ধুর মতো বসবাস করব। আগামী পূর্ণিমা রাতের পরের দিন সকালের দিকে ওই সভা বসবে।

ইঁদুরদের রাজা বলল, হে মার্জার অধিপতি, আপনি দীর্ঘজীবী হন। আপনার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করলাম। সবার জন্য যে দিন ও সময় ঠিক করেছেন সে বিষয়েও আমরা একমত হচ্ছি। আশা করি দিরিন্দিরের মাঠে এই সভা শান্তিস্থাপনের সভারুপেই সফল হবে।

কথাবার্তা শেষ করে মার্জাররাজ যখন অনেক দূরে চলে গেল, তখন মূষিকরাজ তার প্রজাদের ডেকে বলল, বিড়ালদের রাজা বিড়াল আর ইঁদুরের মধ্যে শান্তি স্থাপনের এক প্রস্তাব নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিল। আমি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেছি। গাছপালাশুন্য দিরিন্দিরের মাঠে সভা বসবে। আমি কথা যখন দিয়েছি সে কথা রাখতেই হবে। আর তোমরা তো জানো কথার খেলাপ করা মোটেও সম্মানের কাজ নয়। সুতরাং ওই সভাতে আমাদের সকলকে যেতেই হবে। তবে কথা হচ্ছে এতকালের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এই শিক্ষা পেয়েছি যে বিড়াল জাতটাকে বিশ্বাস করা যায় না। এখন তোমরাই বল কি করলে সব দিক বজায় থাকবে।

ইঁদুর এর আলোচনা সভা - goArif
ইঁদুর এর আলোচনা সভা

তখন প্রজাতির মধ্য থেকে এক বৃদ্ধ বিজ্ঞ ইঁদুর উঠে বলল আমার একটা মতলব শুনুন- যেদিন সভা বসবে তার আগের দিন দিরিন্দির মাঠে গিয়ে প্রত্যেক ইঁদুর নিজের জন্য একটা করে গভীর গর্ত খুঁড়ে রাখুক। যাতে বিড়ালরা কিছু সন্দেহ করতে না পারে সেজন্য গর্তের মাটি মাঠ থেকে বেশ দূরে কোথাও ফেলে আসতে হবে। সভার দিন আমরা যে যার গর্তে ঠিক পাশেই বসে থাকব। বিড়ালের দল যদি শান্তভাবে আসে তাহলে তো কোন কথাই নেই। কিন্তু আমরা যে বিপদের কথা ভাবছি অর্থাৎ বিড়ালরা যদি আমাদের ধরতে আসে আমরা তখনই যে যার গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়বো।

ইঁদুর এর আলোচনা সভা - goArif
ইঁদুর এর আলোচনা সভা

সব ইঁদুর এই উপদেশ মেনে নিয়ে নিজেদের বাসায় ফিরে গেল। বিড়ালদের সঙ্গে সভা বসবার আগেরদিন ইঁদুর দিরিন্দির মাঠে গিয়ে চুপি চুপি যে যার নিজের জন্য একটা গর্ত করে তার মাটি অনেক দূরে ফেলে দিয়ে এলো।

পূর্ণিমা রাতের পরদিন সকালে দিরিন্দির মাঠে সভা। ইঁদুরদের দল বেশ আগেই মাঠে এসে যে যার গর্তের পাশে বসে পড়েছিল। একটু বেলাতে বিরাট এক ভোজের আশা নিয়ে বিড়ালদের দল আসতে শুরু করলো। যখন তারা দিরিন্দির মাঠের বেশ কাছাকাছি এসেছে, বিড়ালদের রাজা তার প্রজাদের মোটামুটি একবার দেখে নিয়ে তাদের সেখানে একটু অপেক্ষা করতে বলল যাতে ইঁদুরের দল কিছু সন্দেহ করতে না পারে। তারপর ইঁদুরের রাজা কে উদ্দেশ্য করে বলল হে মহামান্য মূষিকরাজ আপনার প্রজারা সবাই এসে গেছেন কি?

মূষিকরাজ বলল হা, আমরা সবাই এখানে হাজির। আপনার সব প্রজারা এসেছেন তো?

সব ইঁদুর সভায় হাজির এই পাকা খবর নিয়ে বিড়ালের রাজা বলল হে মূষিককুলের অধিপতি, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। এই সভার আদব-কায়দা সম্বন্ধে আমার প্রজাদের কিছু উপদেশ দিয়ে নি। এই কথা বলে সেই বিড়ালদের আর একবার খুব ভালো করে দেখে নিলো – দেখল সকলেই ইঁদুরদের ধরার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তখন সে আবার ইঁদুরদের দিকে চাইল – সেখানে সব নধর চেহারার ইঁদুরের দল। আর ভোগ-বিলাসের মধ্যে কাটান মুসিক রাজের গোলগাল হৃষ্ট-পুষ্ট চেহারাটা দেখে পর্যন্ত মার্জাররাজ ঠিক করে রেখেছিলেন যে তাকে সে নিজেই ধরে খাবে। যখন সে দেখল যে সব প্রস্তুত সে বিড়ালদের ভাষায় এক রণহুঙ্কার ছাড়লো, বলল, ধর সব ইঁদুরগুলোকে একটাও যেন পালাতে না পারে।

আরো পড়ুনঃ দুলাভাই এর গাড়ি

ইঁদুরদের রাজা যখন দেখল যে বিড়ালের দল তাদের ধরতে আসছে সে তার পিছনের ছোট ছোট দুটো পা এর উপর দাঁড়িয়ে তার প্রজাদের বলল, ভাইগণ গর্তে ঢুকে পড়, মুহূর্ত মাত্র দেরী করোনা। এই কথা বলে মুসিক রাজ নিজেও গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ল। বিড়ালরা এসে পৌছাবার আগেই দিরিন্দিরের মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল, একটা ইঁদুরের চিহ্ন পর্যন্ত রইল না।

সেদিন যে বিড়ালদের শুধু রসাল ভুরিভোজটাই মাঠে মারা গেল তা নয়; তার থেকে খারাপ ব্যাপার হল ইঁদুরদের কাছে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপমানটাই বিড়ালদের ভীষণ মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

সোমালি দেশে একটা প্রবাদ আছে, “তুমি যদি নিজেকে খুব চতুর ভাব, সর্বদাই মনে রাখবে যে তোমার থেকেও চতুর পৃথিবীতে আছে।” বিড়ালরা এই প্রবাদবাক্য টা মনে রাখিনি। বিড়াল ও বুদ্ধিমান ইঁদুর এর গল্প এখানেই শেষ।

ফেসবুক এ আমিঃ Arif Hossain #GoArif

১ টি মন্তব্য

আমাদের মন্তব্য নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করা হয় এবং আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। দয়া করে নাম দেয়ার ক্ষেত্রে কীওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না। আসুন একটি ব্যক্তিগত এবং অর্থপূর্ণ কথোপকথন হয়ে যাক 😊 ।


আর্কাইভ