লাটিম (Pambaram, Latim) বা উত্তর ভারতে যাকে বলে ‘লাট্টু’ – শুধু একটা খেলনা নয়, এটা একটা প্রজন্মের পরিচয়। নব্বইয়ের দশকে যারা বড় হয়েছে, তাদের কাছে লাটিমের ঘূর্ণন শৈশবের অন্যতম প্রধান প্রতীক। কিন্তু আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই ঘূর্ণন থামতে থামতে এখন প্রায় স্তব্ধ।
একটা কাঠের ছোট্ট গোলক, মাঝখানে একটা লোহার শলাকা, আর হাতে গোটা দুয়েক হাত লম্বা সুতো, এটুকুই ছিল একসময়ের বাংলার ছেলেদের সবচেয়ে প্রিয় খেলনা। বিকেলের মেঠোপথে, বাঁশঝাড়ের ছায়ায়, বাড়ির উঠানের কোণে, সুতো পেঁচিয়ে লাটিম ছুঁড়ে দেওয়ার সেই মুহূর্তে যে আনন্দ ছিল, তার তুলনা আজকের কোনো ভিডিও গেমেই নেই।
“সাড়ে চার হাজার বছর পুরোনো লাটিম খেলা আজকের প্রজন্ম চেনে না। ওরা এখন ইন্টারনেটের বদৌলতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকে।”
আরও: হাল বা লাঙল
ইতিহাস ও উৎপত্তি
লাটিম পৃথিবীর প্রাচীনতম খেলাগুলোর মধ্যে একটি। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, কমপক্ষে চার হাজার বছর আগে মিশর, গ্রিস ও রোমে লাটিম-জাতীয় খেলনার ব্যবহার ছিল। প্রাচীন রোমান নথিতেও লাটিমের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই উপমহাদেশে এটি কতকাল ধরে আছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও ঐতিহাসিকদের ধারণা এটি প্রায় সমান পুরনো।
ভারতীয় উপমহাদেশে লাটিম শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়নি, একসময় এটি ভবিষ্যদ্বাণী এবং এমনকি জুয়া খেলার কাজেও ব্যবহৃত হতো বলে লোককথায় উল্লেখ আছে। বিভিন্ন দেশে লাটিমের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে: জাপানে ‘কোমা’, চীনে ‘তুওলুও’, মালয়েশিয়ায় ‘গাসিং’, আর আমাদের বাংলায় ‘লাটিম’ বা ‘লাট্টু’।
বিশ্বজুড়ে লাটিম খেলার প্রতিযোগিতাও হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার চিকো শহরে প্রতি বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়, আর ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে আয়োজন হয় ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের। চীনে তো বিভিন্ন প্রদেশে বিশালাকৃতির ভারী লাটিম ঘোরানো একটি স্বতন্ত্র খেলায় পরিণত হয়েছে।
গঠন ও তৈরির পদ্ধতি
বাংলাদেশের গ্রামীণ লাটিম ঐতিহ্যগতভাবে পেয়ারা বা গাব গাছের ডাল দিয়ে তৈরি হতো। গ্রামের কাঠমিস্ত্রি বা সুতার মিস্ত্রিরাই এই কাজ করতেন। কাঠের গোলকের মাঝখানে একটি লোহার শলাকা (আল বা পেরেক) ঢুকিয়ে দেওয়া হতো, এটিই লাটিমের অক্ষ বা ধুরি। নিচের দিকটা সরু হয়ে যেত, যাতে লাটিম মাটিতে ঘুরতে পারে।
লাটিম ঘোরানোর জন্য দরকার হতো লতি বা ফিতা, যা তৈরি হতো নির্বাচিত পাট থেকে। লোহার শলাকার উপরের দিক থেকে শুরু করে পুরো কাঠের গোলকটি ২-৩ হাত লম্বা এই সুতো দিয়ে সমানভাবে পেঁচানো হতো। তারপর তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলের কৌশলী মোচড়ে উঁচু থেকে ছুঁড়ে দিলেই লাটিম ঘুরতে শুরু করত।
বর্তমানে যে সামান্য লাটিম তৈরি হয়, তা মূলত তুলাজাতীয় নরম কাঠ দিয়ে মেশিনে বানানো হয়। ফিতা তৈরি হয় গেঞ্জির কাপড় থেকে। তবে এই লাটিম বাজারে খুব কমই পাওয়া যায়, হয়তো গ্রামীণ মেলা বা ঈদের বাজারে দেখা মেলে।
খেলার নিয়মকানুন
বাংলাদেশে মূলত তিন ধরনের লাটিম খেলার প্রচলন ছিল:
| খেলার ধরন | বিবরণ | স্তর |
|---|---|---|
| বেল্লাপার | মাটিতে সীমানা দাগ কেটে পরাজিত লাটিমকে সেই সীমানার বাইরে আঘাত করে বের করে দেওয়া হয়। যদি সীমানা পার করতে না পারে, তাহলে আঘাতকারীর লাটিম বেল্লা হয়। | মধ্যম |
| ঘরকোপ | লাটিমের ফিতা দিয়ে মাটিতে বৃত্ত এঁকে তার ভেতরে বন্দী লাটিম রাখা হয়। বাইরে থেকে লাটিম ছুঁড়ে বৃত্তের ভেতরের লাটিমগুলো বের করে দেওয়াই লক্ষ্য। | কঠিন |
| ঘুরতি কোপ | একজন লাটিম ঘুরিয়ে দেয়, বাকিরা নিজেদের লাটিম ঘুরিয়ে সেটাকে আঘাত করার চেষ্টা করে। ঘূর্ণায়মান লাটিম হাতে নিয়েও প্রতিযোগী লাটিমকে কোপ দেওয়া যায়। | সহজ |
বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে লাটিমের ভূমিকা
লাটিম শুধু একটা খেলা ছিল না, এটা ছিল গ্রামীণ সমাজের এক সামাজিক বন্ধনের মাধ্যম। বিকেল হলেই পাড়ার ছেলেরা জড়ো হতো উঠানে বা বাঁশঝাড়ের নিচে। স্কুলের টিফিনের ফাঁকেও চলত লাটিমের প্রতিযোগিতা। কে কার লাটিম জিতে নিতে পারে, এই রোমাঞ্চ ছিল পাড়ার কিশোরদের জীবনের বড় একটা অংশ।
লাটিম খেলা ছেলেমেয়ে উভয়েই খেলতে পারত। দলগত বা একা, দুভাবেই খেলা যেত। এই খেলায় হাতের সূক্ষ্ম দক্ষতা, চোখের নিশানা এবং ধৈর্য্যের চর্চা হতো। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের গ্রামীণ খেলাগুলো শিশুদের মনোঃসংযোগ বাড়ায়, সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করে এবং শারীরিক সক্রিয়তায় রাখে।
জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের গরমেও ছেলেরা লাটিম নিয়ে মাঠে নামত। বর্ষায় স্কুলের বারান্দায়। শীতের সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয়ও চলত আলাপ, কে সবচেয়ে বেশিক্ষণ লাটিম ঘোরাতে পারে। এটা ছিল প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব আর আনন্দের এক অসাধারণ সমন্বয়।
আরও: খড়ম
বর্তমান অবস্থা
নব্বইয়ের দশকের পর থেকে লাটিমের জনপ্রিয়তা দ্রুতগতিতে কমতে শুরু করে। ভিডিও গেম, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, একে একে এসব মাধ্যম গ্রামীণ কিশোরদের উঠান থেকে টেনে নিয়ে গেছে ঘরের কোণে। আজ গ্রামেও লাটিম খেলতে দেখা যায় না তেমন। মেলায় হয়তো রঙিন কিছু লাটিম চোখে পড়ে, কিন্তু সেটা কেনা হয় সংগ্রহের জন্য, খেলার জন্য নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের শহরের শিশুরা লাটিম চেনেই না। গ্রামের নতুন প্রজন্মের মধ্যেও পরিচিতি কমছে দ্রুত। যারা এখন ৩০-৪০ বছর বয়সী, তারাই শেষ প্রজন্ম যাদের হাতে সত্যিকারের লাটিম ঘুরেছে। শিক্ষকরা এবং সংস্কৃতিকর্মীরা এই খেলাটিকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে মনে করছেন।
| যুগ | আনুমানিক প্রাপ্তিস্থান | খেলোয়াড় বয়সসীমা | অবস্থা |
|---|---|---|---|
| ১৯৬০ – ১৯৮০ | প্রতিটি গ্রামে, শহরের মহল্লায় | ৬ – ১৮ বছর | খুব জনপ্রিয় |
| ১৯৮০ – ২০০০ | গ্রামে সর্বত্র, মফস্বলে মাঝেমধ্যে | ৬ – ১৫ বছর | জনপ্রিয় |
| ২০০০ – ২০১০ | প্রত্যন্ত গ্রাম, মেলায় | ৬ – ১২ বছর | কমছে |
| ২০১০ – ২০২৫ | বিরল, মূলত মেলায় | ৫ – ১০ বছর (বিচ্ছিন্ন) | বিলুপ্তপ্রায় |
সংরক্ষণ
লাটিমের মতো খেলাগুলো শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, এগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান মাঝেমধ্যে ঐতিহ্যবাহী খেলার উৎসবে লাটিম রাখে। তবে এটি এখনো কোনো জাতীয় নীতিগত কাঠামোয় সংরক্ষিত হয়নি।
ডিজিটাল সংগ্রহশালা ও স্মৃতিভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো এই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শেকড়ের মতো উদ্যোগ এই খেলাগুলোর ইতিহাস, খেলার নিয়ম, এবং এর সাথে জড়িত স্মৃতিগুলো ধরে রাখছে, যা আগামী প্রজন্মের কাছে একটি জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।
লাটিম শুধু একটা খেলা ছিল না, এটা ছিল এক প্রজন্মের ভাষা। সেই ভাষাটা হারিয়ে যাওয়া মানে একটা পরিচয়ের টুকরো হারিয়ে যাওয়া। শেকড় সেই পরিচয়টাকেই ধরে রাখতে চায়।
আরও: পালকি
লাটিম নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
লাটিম কত বছর পুরনো খেলা?
লাটিম পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো খেলাগুলোর একটি। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী কমপক্ষে চার থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগেও মিশর, গ্রিস ও রোমান সভ্যতায় লাটিম-জাতীয় খেলনা ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশেও এর ইতিহাস প্রাচীন।
বাংলাদেশে লাটিম কী দিয়ে তৈরি হতো?
ঐতিহ্যগতভাবে পেয়ারা ও গাব গাছের ডাল দিয়ে লাটিম তৈরি হতো। মাঝখানে লোহার একটি শলাকা বা পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হতো যা অক্ষ হিসেবে কাজ করত। সুতো বা ফিতা তৈরি হতো পাট থেকে। বর্তমানে যেটুকু তৈরি হয় তা মেশিনে নরম কাঠ দিয়ে।
লাটিম খেলা বিলুপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ কী?
স্মার্টফোন, ভিডিও গেম, পাবজি-ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেম এবং সোশ্যাল মিডিয়া – এগুলোই মূল কারণ। এছাড়া গ্রামীণ খেলার মাঠ কমে যাওয়া, পরিবারের শিশুদের নিরাপত্তার ভয়, এবং এই খেলার কারিগর ও বাজার না থাকাও বড় কারণ।