ঘুড়ি

"ভো কাট্টা!" - এই একটা চিৎকারে একসময় পুরো পাড়া উথলে উঠত। কাটা ঘুড়ি ধরতে দৌড় লাগত কিশোরের দল। সেই আকাশছোঁয়া আনন্দের নাম ঘুড়ি।

ঘুড়ি (Kite) শুধু একটি খেলনা নয়, এটি বাংলাদেশ সহ পুরান ঢাকার পরিচয়ের অংশ, সাকরাইনের প্রাণ, শিশুর স্বপ্নের বাহন। পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলির উপরে আকাশটুকুতে শত শত রঙিন ঘুড়ি উড়লে বোঝা যায়, এই শহরের আনন্দের ধরন একদম আলাদা। ছাদের রেলিং ধরে ঝুঁকে পড়া, লাটাই থেকে সুতা ঢিল দেওয়া, বাতাসের বিপরীতে দৌড়ানো, ঘুড়ি ওড়ানো কখনো শুধু খেলা ছিল না, এটা ছিল আকাশের সাথে এক ধরনের কথোপকথন। যে ছেলে মাটিতে সাইকেলও পায়নি, সে বাঁশের কঞ্চি আর রঙিন কাগজে তৈরি ঘুড়ি দিয়ে আকাশ জয় করত।

আরও: জব্বারের বলীখেলা

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাংলা নামঘুড়ি, পটং
ইংরেজি নামKite
উৎপত্তিচীন, প্রায় ২৮০০ বছর আগে
বাংলায় প্রচলনমোগল আমল থেকে
উপাদানকাগজ, বাঁশের কঞ্চি, সুতা
মাঞ্জার উপাদানকাচের গুঁড়া, আঠা, রং
প্রধান উৎসবসাকরাইন (১৪ জানুয়ারি)
বর্তমান অবস্থাটিকে আছে, তবে কমেছে

ইতিহাস

বিশেষজ্ঞদের ধারণামতে প্রায় ২৮০০ বছর পূর্বে চীনে সর্বপ্রথম ঘুড়ির উৎপত্তি ঘটে। সেখান থেকে পরবর্তীকালে বাংলাদেশ, ভারত, জাপান ও কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপে ঘুড়ির প্রচলন হয় প্রায় ১৬০০ বছর আগে। বাংলায় ঘুড়ি উড়ানোর ইতিহাস মোগল আমলের সাথে জড়িত। ১৭৪০ সালে মোগল আমলে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের সময়ে পুরান ঢাকায় প্রথম ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন শুরু হয়। সেই থেকে ঘুড়ি পুরান ঢাকার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে।

মোগল আমলে নবাব ও অভিজাতরা শখের বশে ঘুড়ি উড়াতেন। পরে এটি সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ আমলে ঘুড়িতে স্লোগান লিখে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার হয়েছে।

আরও: গোল্লাছুট

গঠন ও উপকরণ

ঘুড়ি তৈরি একটা শিল্প, যেটা প্রতিটি পাড়ার কোনো না কোনো দক্ষ মানুষ জানতেন। পাতলা রঙিন কাগজ (টিস্যু পেপার বা পলিথিন) দিয়ে শরীর, বাঁশের চিকন কঞ্চি দিয়ে কাঠামো, আর মজবুত সুতা দিয়ে সংযোগ, এই তিনটে মিলিয়েই ঘুড়ি।

ঘুড়ির লেজ থাকে ভারসাম্যের জন্য। সামনের দিকে একটু বাঁকানো থাকে হাওয়া ধরার জন্য। সুতার টান আর বাতাসের চাপের মধ্যে যে ভারসাম্য, সেটাই ঘুড়িকে আকাশে রাখে। ছোট থেকে বিশাল, একটা ঘুড়ি মাত্র কয়েক ইঞ্চি থেকে শুরু করে কয়েক মিটার পর্যন্ত হতে পারে।

মাঞ্জা

ঘুড়ি ওড়ানো আর ঘুড়ি লড়াই, দুটো আলাদা বিষয়। লড়াইয়ে জিততে হলে চাই ধারালো সুতা, যার নাম মাঞ্জা। মাঞ্জা লাগানো সুতায় বিপক্ষের ঘুড়ির সুতা ঘষে কাটা যায়।

সাকরাইন

পুরান ঢাকার মানুষ এই দিনকে বলেন “সাকরাইন” – ঢাকাইয়া ভাষায় “হাকরাইন”। এটি আদি ঢাকাইয়াদের পিঠাপুলি খাওয়ার উপলক্ষ আর সাথে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতার দিন। “সাকরাইন” শব্দটি সংস্কৃত “সংক্রান্তি” থেকে এসেছে, অর্থ বিশেষ মুহূর্ত।

“বুক কাট্টা, মাঞ্জা, গুড়ি পড়লো, এই শব্দে আকাশ মুখর হয়ে ওঠে সাকরাইনে।” – পুরান ঢাকার ঘুড়িওয়ালা

ঘুড়ি শুধু আনন্দের জন্য নয়, ইতিহাসে এটি বিজ্ঞানেরও হাতিয়ার হয়েছে। ১৭৫২ সালে বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন বজ্রপাতের সময় ঘুড়ি উড়িয়ে বিদ্যুতের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন। রাইট ভাইয়েরা বিমান তৈরির আগে ঘুড়ি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। এমনকি আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাসেও একসময় ঘুড়ি ব্যবহার হয়েছে।

গ্রামে এবং ছোট শহরে ঘুড়ি ওড়ানো কমেছে নাটকীয়ভাবে। কারণ একটাই, খোলা মাঠ ও ছাদের অভাব। উঁচু দালান, বিদ্যুতের তার, মোবাইলের আসক্তি – সবমিলিয়ে ঘুড়ির আকাশ সংকুচিত হয়ে গেছে।

তবে পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসব উল্টো দিকে হেঁটেছে। বিগত দুই দশকে সাকরাইন ছোট থেকে বিশাল উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখন দেশের বাইরে থেকেও মানুষ সাকরাইনে আসে। ঢাকার অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

আরও: কাবাডি

বর্তমান অবস্থা

আজকের বাংলাদেশে ঘুড়ির অবস্থা মিশ্র। গ্রামে কমেছে, পুরান ঢাকায় বেড়েছে। শহরের পার্কে কিছু মানুষ এখনো সপ্তাহান্তে ঘুড়ি ওড়ান। শিশুরা ঘুড়ি চেনে, তবে নিজে বানিয়ে ওড়ানোর চর্চা কমে গেছে।

ঘুড়ি এখন পুরান ঢাকার পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। সাকরাইন ছাড়াও আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসবে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এবং একটা ভালো দিক, ঘুড়ি তৈরির শিল্পীরা এখনো আছেন পুরান ঢাকার গলিতে।

ঘুড়ি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা

“ভো কাট্টা” কথাটা কোথা থেকে এসেছে?

“ভো কাট্টা” -এটি মূলত হিন্দি-উর্দু মিশ্রিত শব্দ। “ভো” মানে “উহ” বা উদ্বেগের উচ্চারণ, আর “কাট্টা” মানে “কেটে গেছে”। মোগল আমলে ঢাকায় ফারসি-উর্দুর প্রভাবের কারণে এই শব্দটি বাংলা ঘুড়ির ভাষায় ঢুকে যায়। পুরান ঢাকায় এখনো এই চিৎকারটাই দেওয়া হয়, এটা স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। একটু আঞ্চলিক টানে বলা হয় “ভুয়া কাট্টা” বা শুধু “কাট্টা!”

মাঞ্জা কি বিপজ্জনক?

হ্যাঁ, বিশেষত চায়না মাঞ্জা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঐতিহ্যবাহী মাঞ্জা কাচের গুঁড়া দিয়ে তৈরি, যা ঘুড়ির সুতায় লাগানো থাকে। এই সুতা যদি গলা বা হাতে লাগে তাহলে মারাত্মক কেটে যেতে পারে। চায়না মাঞ্জা আরো বেশি তীক্ষ্ণ ও ধারালো। বাংলাদেশ সরকার চায়না মাঞ্জার উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। মোটরসাইকেল আরোহীর গলায় মাঞ্জা লেগে দুর্ঘটনার খবরও এসেছে।

সাকরাইন কি শুধু হিন্দুদের উৎসব?

না। সাকরাইনের উৎস মকর সংক্রান্তি, যা হিন্দু পঞ্জিকার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু ঢাকায় পৌষসংক্রান্তির এই উৎসব কালের পরিক্রমায় সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। এতে সব ধর্ম ও পেশার মানুষ অংশ নেন। পুরান ঢাকার মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ সবাই মিলে এই উৎসব পালন করেন। এটি বাংলাদেশের ঐক্য ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

ঘুড়ি কি বিজ্ঞানে কাজে লেগেছে?

হ্যাঁ, ঘুড়ির বৈজ্ঞানিক ব্যবহার বেশ পুরনো। ১৭৫২ সালে বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন বজ্রপাতের সময় ঘুড়ি উড়িয়ে বিদ্যুতের প্রকৃতি প্রমাণ করেন, যার ফলে পরে লাইটনিং রড তৈরি হয়। রাইট ভাইয়েরা বিমান আবিষ্কারের আগে ঘুড়ি দিয়ে বায়ুগতির পরীক্ষা করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বায়ু পর্যবেক্ষণে এবং আবহাওয়া বিভাগে ঘুড়ি ব্যবহার হয়েছে।

আরও: লাটিম

শেয়ার করুন
গোআরিফ লগো আইকনগোআরিফ লগো আইকন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।