হারিকেন (বাতি) (Kerosene Lamp) শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আগের দিনের সেই সন্ধ্যার ছবি। মাঠের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে আসা ক্লান্ত কৃষক, বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো টিমটিমে আলো, মায়ের রান্নাঘরে হলদে নরম আভার আলো, এই সব মিলিয়ে হারিকেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের একটা আস্ত অধ্যায়ের সাক্ষী। বিদ্যুৎ আসার আগে প্রতিটি ঘরে ঘরে এই বাতি ছিল রাতের অন্ধকারের একমাত্র সমাধান।
হারিকেন শুধু আলো দিত না, এটা ছিল পরিবারের একটা সদস্যের মতো! একটু বেশি বলে ফেললাম নাকি? নাহ, এটা আসলে রাতের অন্ধকার দূর করার সাথী ছিল। সন্ধ্যায় জ্বালানো, রাতে নিভিয়ে ঘুমানো, সকালে উঠে আবার প্রস্তুত রাখা, এই ছন্দটাই ছিল গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন রুটিন। কি মনে পড়ছে সেই দিন গুলোর কথা? নস্টালজিক লাগছে তাই না?
আরও: গরুর গাড়ি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| পরিচিত নাম | হারিকেন, হ্যারিকেন |
| ইংরেজি নাম | Hurricane Lantern |
| জ্বালানি | কেরোসিন তেল |
| উদ্ভাবন | ১৮৫৩ সাল |
| উপমহাদেশে প্রসার | ঊনবিংশ শতক |
| বাংলাদেশে প্রচলন | বিশ শতকের শুরু |
| বর্তমান অবস্থা | প্রায় অব্যবহৃত |
| উপাদান | টিন, কাচ, তার, সুতা |
ইতিহাস ও উদ্ভব
কেরোসিন বাতির আধুনিক রূপটি তৈরি হয় ১৮৫৩ সালে। পোলিশ উদ্ভাবক ইগনাসি উকাসিয়েভিচ এবং আমেরিকান রবার্ট এডউইন ডিয়েট্জ প্রায় একই সময়ে স্বাধীনভাবে এই বাতির নকশা করেছিলেন। এর আগে ১৮৪৬ সালে কানাডিয়ান ভূতাত্ত্বিক আব্রাহাম গেসনার কয়লা পাতন করে কেরোসিন আবিষ্কার করেছিলেন, যা তেল থেকে উৎপাদিত হলে বাতির জ্বালানি হিসেবে দুনিয়াজোড়া জনপ্রিয় হয়ে যায়।
হারিকেন বা বাতি ল্যাম্পের বিশেষত্ব হলো এর কাচের চিমনি, যা ঝড়-বাতাসেও আলো নিভতে দেয় না। এই কারণেই এর নাম “হারিকেন”, ইংরেজিতে যার অর্থ ঝড়। এটা আগে জানতেন কি? ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত উপমহাদেশে কেরোসিন ও হারিকেন বাতির প্রচলন শুরু হয়েছিল। এরপর ঢাকায় ১৮৭৭ সালে প্রথম কেরোসিনের রাস্তার বাতি জ্বালানো হয়েছিল, রানি ভিক্টোরিয়ার ভারতের সম্রাজ্ঞী হওয়ার উৎসবে। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ঘরে হারিকেনের প্রবেশ ঘটতে শুরু করে।
বিশ শতকের শুরু থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত, হারিকেন বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবারগুলোর রাতের প্রধান আলোর উৎস ছিল। অবশ্যই ২০০০ সালের পরেও বাংলাদেশের সব স্থানে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক পরিবারে হারিকেন ব্যাবহার হতো। স্থানীয় হাটবাজারে টিনের হারিকেন বিক্রি হত, কারিগররা মেরামত করতেন, এবং প্রতিটি বাড়িতে কেরোসিনের বোতল সংরক্ষণ করা হতো।
আরও: পালকি
গঠন ও প্রকারভেদ
হারিকেনের কাঠামো বেশ সরল। নিচে থাকে টিনের তেলের ট্যাংক, যেখানে কেরোসিন রাখা হয়। ট্যাংক থেকে সুতার তৈরি সলতে তেল শুষে উপরে ওঠে এবং আগুনে জ্বলে আলো দেয়। সলতার চারপাশে কাচের চিমনি বসানো থাকে। চিমনির কারণে বাতাস নিয়ন্ত্রিতভাবে ভেতরে ঢোকে, যা আলোকে স্থিতিশীল রাখে এবং ঝড়েও নিভতে দেয় না। পাশে থাকে একটা নব বা রেগুলেটর, যা দিয়ে সলতা উঠিয়ে বা নামিয়ে আলো কম-বেশি করা যায়। আর উপরে তারের হাতল দিয়ে বাতিটা সহজেই বহন করা যায়। তবে, সলতে থেকে উঠা কালো ধোঁয়ায় কাচের চিমনি ঘোলা হয়ে যায় তাই প্রায় প্রতিদিনই এটি কাপড় বা ন্যাকড়া দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হয়।
বাংলাদেশে হারিকেনের পাশাপাশি কয়েক ধরনের বাতি একসাথে প্রচলিত ছিল:
| বাতির নাম | গঠন ও বৈশিষ্ট্য | আলোর মাত্রা | ব্যবহারকারী |
|---|---|---|---|
| হারিকেন | টিনের ট্যাংক, কাচের চিমনি, তারের হাতল | মাঝারি | প্রায় সব পরিবার |
| কুপিবাতি | ছোট পাত্র (মাটি/কাচ), কোনো চিমনি নেই | কম | দরিদ্র পরিবার |
| হাজাক (Petromax) | প্রেশার ল্যাম্প, ম্যান্টেল সহ | অনেক বেশি | হাটবাজার, অনুষ্ঠান |
| ডিবি বাতি | বড় পাত্র, সলতে ভেসে থাকে | কম-মাঝারি | ধর্মীয় অনুষ্ঠান |
| লণ্ঠন | হারিকেনের ছোট সংস্করণ, ভ্রমণে ব্যবহার্য | কম | মাঝি, পথিক |
গ্রামীণ জীবনে হারিকেনের ভূমিকা
“হারিকেনের আলোয় পড়ে ডাক্তার হয়েছি” — এই কথা আজও অনেক প্রবীণ মানুষ গর্বের সাথে বলেন।
বলতে গেলে হারিকেন শুধু একটা বাতি ছিল না, এটা ছিল গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিলে হারিকেন রেখে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করত। গ্রামের সেই প্রজন্মটাই পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, চাকরি করেছে, দেশ গড়েছে, হারিকেনের আলোয় পড়া সেই ছেলেমেয়েরাই।
কৃষি ও নদীপথে
ভোরের আঁধারে কৃষক যখন মাঠে যেতেন, হাতে থাকত হারিকেন। রাতে ফিরতে দেরি হলেও পথ চেনার ভরসা এই বাতি। নৌকার গলুইয়ে ঝোলানো হারিকেন রাতের অন্ধকার নদীতে পথ দেখাত। মাঝিরা হারিকেন দিয়ে অন্য নৌকাকে সংকেতও দিতেন, বাঁ দিকে যেতে হলে বাম হাতে, ডানে গেলে ডান হাতে ঈশারা দিতেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে
গ্রামের উঠানে বৈঠক, সালিস, বিয়ের অনুষ্ঠান, পালাগান সব কিছুতেই হারিকেন থাকত। হাটে দোকানের সামনে ঝোলানো হারিকেন ক্রেতাদের আকর্ষণ করত। যাত্রাপালার আসরে সারিবদ্ধ হারিকেনের আলোয় দর্শকেরা জড়ো হত।
মায়েদের সন্ধ্যার রান্না হত হারিকেনের আলোয়। হারিকেনের চিমনি মোছা, সলতে ছাঁটা, তেল ভরা, এগুলো ছিল গৃহিণীর নিত্যকাজের অংশ। পাড়ার মুদি দোকান থেকে কেরোসিন কিনে আনা, বোতলে মেপে রাখা, এই ছোট ছোট কাজগুলো গ্রামীণ জীবনকে একটা নিজস্ব ছন্দ দিয়েছিল।
সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে
হারিকেন বাংলা সাহিত্যেও বারবার এসেছে। জসীমউদ্দীনের কবিতা, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস, এমনকি লোকগানেও হারিকেনের উল্লেখ মেলে। “রাতের বেলা হারিকেল জ্বালাও” – এই রকম কথা গ্রামীণ জীবনের গানে বহু আগে থেকে ছিল। হারিকেন যেন হয়ে উঠেছিল গ্রামীণ বাংলার একটা চিরপরিচিত প্রতীক।
বিদ্যুতায়ন ও হারিকেনের বিদায়
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবার (%)। দশক অনুযায়ী গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের অগ্রগতি (আনুমানিক, %):

বাংলাদেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (REB) গঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। সেই থেকে ধীরে ধীরে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে শুরু করে। ১৯৮০-র দশকে মাত্র ৫-৬% পরিবারে বিদ্যুৎ ছিল। ২০১০ সালের মধ্যে সেটা ৫৫%-এ পৌঁছায়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ৯৮% পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
বিদ্যুৎ যত গ্রামে ঢুকেছে, হারিকেন তত কোণে সরে গেছে। ১৯৯০-এর দশকে যে গ্রামে প্রথম বিদ্যুতের খুঁটি বসেছে, সেই গ্রামের মানুষ সেদিন থেকেই হারিকেন তুলে রেখে দিয়েছে। সেই “তুলে রাখা” আস্তে আস্তে হয়ে গেছে “ফেলে দেওয়া”!
বর্তমান অবস্থা
বলা যায় যে, আজকের বাংলাদেশে হারিকেন প্রায় বিলুপ্ত। তবে একদম নেই, তা-ও বলা যাবে না। হাওর অঞ্চলের দুর্গম চরে, পাহাড়ি প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো মাঝে মাঝে হারিকেন জ্বলে। লোডশেডিং বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেকে পুরনো হারিকেন বের করেন।
অনলাইনে এখন “ভিন্টেজ হারিকেন” বিক্রি হয়, তবে সেটা মূলত নস্টালজিয়া বা ক্যাম্পিংয়ের জন্য, বাড়ির আলোর জন্য নয়। কিছু পুরনো বাড়ির সংগ্রহে এখনো হারিকেন আছে – ধুলো জমা, কিন্তু স্মৃতি অটুট।
এটাও মনে রাখার মতো যে, হারিকেনের সাথে একটা পুরো শিল্পও বিলুপ্ত হয়েছে। টিনের হারিকেন বানানোর ছোট কারখানা, কেরোসিনের পাইকারি ব্যবসা, হারিকেন মেরামতের কারিগর, এই পেশাগুলোর কথা এখন অনেকেই মনে করতে পারেন না। শেকড়ে আমরা বাংলাদেশের হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের একটি ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি।
হারিকেন নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
হারিকেনের নাম “হারিকেন” কেন হলো?
ইংরেজি “Hurricane” শব্দের অর্থ ঝড় বা তুফান। এই বাতির কাচের চিমনি এতটাই কার্যকরভাবে আগুনকে রক্ষা করে যে প্রচণ্ড ঝড়েও বাতি নিভে না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইংরেজিতে এর নাম হয় Hurricane Lantern। বাংলাদেশ ও ভারতে সেই নামটাই বাংলায় রূপান্তরিত হয়ে “হারিকেন” হয়ে গেছে।
হারিকেনে কতক্ষণ আলো পাওয়া যেত?
একটি মাঝারি আকারের হারিকেনে আধা লিটার কেরোসিন দিলে সাধারণত ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা আলো পাওয়া যেত। আলো বাড়ালে (সলতে বেশি উঠিয়ে) তেল বেশি খরচ হত এবং আলো কমিয়ে রাখলে তেল বাঁচত। গ্রামীণ পরিবারগুলো সাধারণত তেলের অপচয় কমাতে আলো একটু কম রাখত।
হারিকেন ও কুপিবাতির মধ্যে পার্থক্য কী?
কুপিবাতি হলো একটি ছোট, সরল পাত্র যেখানে তেলে সলতা ডুবিয়ে রেখে আলো জ্বালানো হয়, কোনো কাচের চিমনি নেই। ফলে বাতাসে সহজেই নিভে যায় এবং আলোও কম দেয়। হারিকেনে কাচের চিমনি থাকায় এটা বেশি উজ্জ্বল, বায়ুরোধী এবং বহনযোগ্য। হারিকেন তুলনামূলক দামি ছিল, তাই গরিব পরিবার কুপিবাতি ব্যবহার করত।
বাংলাদেশে হারিকেন তৈরি হত কোথায়?
একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছোট ছোট টিনের কারখানায় হারিকেন তৈরি হত। ঢাকার পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং অন্যান্য শহরে এই শিল্প ছিল। পাশাপাশি চীন থেকেও আমদানি করা হারিকেন বাজারে পাওয়া যেত। গ্রামীণ হাটে স্থানীয় কারিগরের তৈরি ও বিদেশি – দুই ধরনের হারিকেনই বিক্রি হত।
এখন কি কোথাও হারিকেন পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, এখনো পাওয়া যায়! তবে সেটা সচরাচর ব্যবহারের জন্য কমই। পুরান ঢাকার কিছু পুরনো দোকানে, গ্রামের হাটে এবং অনলাইন শপিং সাইটে হারিকেন পাওয়া যায়। তবে এগুলো বেশিরভাগই এখন সংগ্রহযোগ্য বস্তু (collectible), ক্যাম্পিং সরঞ্জাম বা গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।