জব্বারের বলীখেলা

১৯০৯ সালে এক ব্যবসায়ীর দেশপ্রেম থেকে জন্ম নেওয়া কুস্তির আসর আজ ১১৭ বছর পেরিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলায় পরিণত হয়েছে। লালদিঘির মাঠ থেকে প্রতি বছর ১২ বৈশাখ উঠে আসে সেই গর্জন।

জব্বারের বলীখেলা (Boli Khela), বাংলাদেশে এমন আর কোনো খেলার আসর নেই যেটা টানা ১১৭ বছর ধরে একই দিনে, একই মাঠে, একই উদ্দীপনায় আয়োজিত হয়ে আসছে। দুটো বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, করোনা মহামারি সবকিছুর পরেও থামেনি এই আসর।

চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দান। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ বিকেলে এখানে জমে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। মাটিতে রাখা কুস্তির রিং, চারপাশে হাজার হাজার দর্শক, ধুলো উড়ছে, ঢাক বাজছে আর মাঠের মাঝখানে দুজন সুঠামদেহী বলী একে অপরকে কাবু করার চেষ্টা করছেন। এটাই জব্বারের বলীখেলা।

আরও: গোল্লাছুট

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

প্রতিষ্ঠাতাআবদুল জব্বার সওদাগর
শুরু১৯০৯ সাল (বাং. ১৩১৬)
তারিখপ্রতি বছর ১২ বৈশাখ
স্থানলালদিঘি ময়দান, চট্টগ্রাম
খেলার ধরনকুস্তি (মল্লযুদ্ধ)
অংশগ্রহণকারীবলী (কুস্তিগির)
মেলার বিস্তারপ্রায় ৩ কিলোমিটার
মেলার সময়কাল৫–৬ দিন (আনুষ্ঠানিকভাবে ৩)
বর্তমান অবস্থাসক্রিয়, বার্ষিক আয়োজন

প্রতিষ্ঠাতা আবদুল জব্বার সওদাগর

চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুব সমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে তৈরি করতে ১৯০৯ সালে নিজ উদ্যোগে এই বলীখেলার আয়োজন করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধি দিতে চেয়েছিল, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই আসর “জব্বারের বলীখেলা” নামে অমর হয়ে যায়।

জব্বারের বলীখেলা - শেকড়

ইতিহাস

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ব্রিটিশ শাসন শুরু হলে বাঙালি জাতির মনোবল ভাঙতে থাকে। সেই সময়ে আবদুল জব্বার সওদাগর উপলব্ধি করলেন, শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, তরুণ প্রজন্মকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ (ইংরেজি ২৫ এপ্রিল) লালদিঘির মাঠে প্রথম বলীখেলার আয়োজন করেন তিনি।

বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ বইয়ে উল্লেখ আছে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অনুশীলন সমিতির বলীখেলাসহ বিভিন্ন শক্তি প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিল। জব্বার সওদাগরের উদ্যোগ সেই চেতনারই অংশ। চট্টগ্রাম মূলত “বলির দেশ”। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদের মধ্যবর্তী প্রায় ২০টি গ্রামে মল্ল উপাধিধারী মানুষের বসবাস ছিল, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কুস্তির চর্চা করে আসছেন। এই মল্লবীরেরাই ছিলেন জব্বারের বলীখেলার মূল আকর্ষণ।

আরও: কাবাডি

বলীখেলার নিয়ম ও কুস্তির ধরন

বলীখেলা হলো এক বিশেষ ধরনের কুস্তি যা মূলত মাটির রিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তিকে “বলীখেলা” এবং কুস্তিগিরকে “বলী” বলা হয়, বলী অর্থ শক্তিশালী বা বলবান ব্যক্তি। দুজন বলী মুখোমুখি হন, লক্ষ্য বিপক্ষকে মাটিতে ফেলে দেওয়া। কুস্তির ধরন, ক্লিঞ্চ ফাইটিং, থ্রো, টেকডাউন, জয়েন্ট লক এবং বিভিন্ন ধরনের গ্র্যাপলিং কৌশল ব্যবহার হয়।

বিজয়ের শর্তবিপক্ষকে সম্পূর্ণ মাটিতে ফেলে দিলে বিজয়
অনুমোদিত কৌশলধরা, চাপা দেওয়া, তোলা ও ফেলা — আঘাত নিষিদ্ধ
পোশাককাপড়ের লেংটি বা শর্টস — ঐতিহ্যগত পোশাকেই খেলা
বয়স বিভাগবিভিন্ন বয়সের জন্য আলাদা রাউন্ড
অংশগ্রহণকারীর উৎসটেকনাফ, রামু, চকরিয়া, বাঁশখালী, পটিয়া, পার্বত্য অঞ্চল, কুমিল্লা
পুরস্কারক্রেস্ট, সনদ ও নগদ অর্থ

বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদিঘির চারপাশে প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে বসে বৈশাখী মেলা, যা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লোকজ মেলা হিসেবে স্বীকৃত। আন্দরকিল্লা মোড় থেকে কোতোয়ালি মোড়, জেল রোড, সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমান অবস্থা

আজকের বলীখেলায় একটা স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। পেশাদার বলী বা মল্লবীরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মূল কুস্তির আকর্ষণ আগের মতো নেই। তবে মেলার আকর্ষণ বেড়েছে বহুগুণ। অনেকেই এখন বলীখেলার চেয়ে বৈশাখী মেলার জন্যই লালদিঘিতে আসেন।

চট্টগ্রামের পাশাপাশি এখনো জেলার বিভিন্ন স্থানে বলীখেলার আসর আছে, কক্সবাজারে “ডিসি সাহেবের বলীখেলা”, সাতকানিয়ায় “মক্কার বলীখেলা”, রাউজানে “দোস্ত মোহাম্মদের বলীখেলা”। তবে জব্বারেরটাই সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন। আয়োজক কমিটির দাবি, রাষ্ট্রীয়ভাবে আবদুল জব্বার সওদাগরকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া এবং চট্টগ্রামে একটি বলীখেলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা।

আরও: লাটিম

বলীখেলা নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা

‘বলী’ মানে কী?

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় u0022বলীu0022 অর্থ শক্তিশালী বা বলবান ব্যক্তি, বিশেষত কুস্তিগির। কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদের মধ্যবর্তী গ্রামের মল্ল পরিবারগুলো বংশপরম্পরায় কুস্তির চর্চা করে আসছে। ছোটবেলা থেকেই শারীরিক অনুশীলন, বিশেষ খাদ্যাভ্যাস এবং প্রবীণ বলীদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন বলী তৈরি হন। এখন অবশ্য এই বংশগত পেশার চর্চা অনেক কমে গেছে।

জব্বার সওদাগর কেন ব্রিটিশ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?

আবদুল জব্বার সওদাগর মূলত ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব থেকেই বলীখেলার আয়োজন করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল তরুণ প্রজন্মকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। সেই মানুষ ব্রিটিশদের দেওয়া u0022খান বাহাদুরu0022 উপাধি গ্রহণ করলে তাঁর নিজের আদর্শের সাথে বিরোধ হত। তাই তিনি দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন, এটি তাঁর দেশপ্রেমের সবচেয়ে সাহসী প্রকাশ।

এই আসর কি কখনো বন্ধ হয়েছে?

মাত্র দুবার বন্ধ হয়েছে, করোনা মহামারির সময় ২০২০ ও ২০২১ সালে। ১১২ বছরের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় এই প্রথম বাধা পড়ে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, কিছুই এই আসর থামাতে পারেনি। এমনকি পাকিস্তান আমলেও লালদিঘির মাঠে ১২ বৈশাখ বলীখেলার আসর বসেছে।

শেয়ার করুন
গোআরিফ লগো আইকনগোআরিফ লগো আইকন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।