কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত (Kuakata Sea Beach) বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থানার লতাচাপলি ইউনিয়নে রয়েছে। সাগরকন্যা হিসেবে পরিচিত এই সমুদ্র সৈকতটি প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এটিই বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত যেখান থেকে আপনি একসাথে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখতে পাবেন।
কক্সবাজার থেকে এই সৈকতে বিশেষ হলো এর বড় বড় ঢেউ। এখানের পরিবেশ অনেটাই পরিচ্ছন্ন এবং এটি অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত, দিগন্তজোড়া সুনীল আকাশ এবং ম্যানগ্রুভ বন কুয়াকাটাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
আরও: শাপলা গ্রাম
| ধরন | দর্শনীয় স্থান |
| অবস্থান | মহিপুর, কলাপাড়া, পটুয়াখালী, বরিশাল, বাংলাদেশ |
| আয়তন | দৈর্ঘ্য: ১৮ কিলোমিটার, বিস্তৃতি: ৩ কিলোমিটার |
| অন্যনাম | সাগরকন্যা |
| ঢাকা থেকে দূরত্ব | ৩৮০ কিলোমিটার (সড়কপথ) |
| বরিশাল থেকে দূরত্ব | ১০৮ কিলোমিটার |
| পটুয়াখালী সদর থেকে দূরত্ব | ৭০ কিলোমিটার |
| ড্রোন উড়ানো যাবে | হ্যাঁ |
কুয়াকাটা নামের উৎপত্তি হয়েছে কুয়াকাটার ‘কুয়া’ শব্দটি এসেছে ‘কুপ’ থেকে। প্রচলিত একটি ধারনা রয়েছে যে, আরাকানরা প্রায় ১৮ শতকের দিকে মুঘল শাসকদের দ্বারা বার্মা থেকে বিতাড়িত হয়ে বহু রাখাইন নৌকাযোগে বঙ্গোপসাগরের তীরের রাঙ্গাবালি দ্বীপে অবতরণ করে এবং বর্তমানের কুয়াকাটা অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। তখন এখানে খাবার পানির সমস্যা ছিল তাই তারা এখানে প্রচুর কুয়ো বা কুপ খনন করেছিল। সেই থাকে এই অঞ্চলের নাম কুয়াকাটা হয়েছে। তবে এটা প্রচলিত ধারণা।
কুয়াকাটা হচ্ছে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান। অগণিত ভক্তরা এখানে ‘রাস পূর্ণিমা’ এবং ‘মাঘী পূর্ণিমা’ উৎসবে উপস্থিত হন। এই উপলক্ষে তীর্থযাত্রীরা উপসাগরে পবিত্র স্নান করেন এছাড়া ঐতিহ্যবাহী মেলায়ও অংশ নেন তারা। আদমশুমারি ২০১১ অনুযায়ী কুয়াকাটায় মোট জনসংখ্যা ছিল ৯,০৭৭ জন এবং পরিবার এর সংখ্যা ছিল ২,০৬৫ টি।
কুয়াকাটা যাবেন আর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখবেন না তা কি হয়! সূর্যোদয় দেখার জন্য ঝাউ বনে যাওয়াই ভালো। সেখান থেকেই সূর্যোদয় ভালো দেখা যায়। সমুদ্রের ভিতর থেকে কিভাবে সূর্য উঠে তা দেখার জন্য অনেক লোকই আগে চলে যাণ সেখানে।
আর সূর্যাস্তের দৃশ্যটা আরও চমৎকার। সূর্যটা সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার সময় রংয়ের পরিবর্তনটা আপনি স্পষ্টই দেখাতে পাবেন। কি যে দারুণ লাগে দেখতে। দৃষ্টিনন্দন সূর্যাস্ত দেখার জন্য পর্যটকরা ভিড় জমান কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিম প্রান্ত ‘লেবুর বনে’। তবে, সৈকতের যেকোন প্রান্ত থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায়।
আরও: তারুয়া সমুদ্র সৈকত
কি কি দেখবেন
কুয়াকাটার প্রধান আকর্ষণ হলো সমুদ্র সৈকত। এছারা দেখার মত এখানে আর বেশ কিছু দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। নিচে ছোট্ট একটা লিস্ট দেয়া হলো:
- কুয়াকাটা বৌদ্ধ মন্দির
- ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী নৌকা
- কুয়াকাটার কুয়া
- কাউয়ার চর
- চর গঙ্গামতী
- ঝাউ বন
- লাল কাঁকড়ার চর
- রূপালী দ্বীপ
- বৌদ্ধ বিহার
- কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান
- পাখি মারা পানি যাদুঘর
- মিষ্টি পানির কূপ
- রাখাইন পল্লী
- বার্মিজ মার্কেট
- শুঁটকি পল্লী
- ঝিনুক বীচ
- লেবুর চর
- তিন নদীর মোহনা
- ফাতরার বন (সুন্দরবনের পূর্বাংশ)
- স্বপ্ন রাজ্য
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে: গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু বাস ছেড়ে যায়। উল্লেখযোগ্য পরিবহণ হল- দ্রুতি পরিবহন, সাকুরা পরিবহন। এসব বাস আপনাকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ২০০ মিটার দূরে নামিয়ে দিবে। ভাড়া নিতে পারে ৫০০-৫৫০ টাকা এবং সময় লাগবে ৮থেকে ১৩ ঘন্টা।
তবে সহজ উপায় হলো, ঢাকার সায়েদাবাদ, আবদুল্লাপুর, আরামবাগ, অথবা গাবতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে ভালো মানের শ্যামলী পরিবহন, সাকুরা পরিবহন, গ্রীনলাইন, ইউরো কোচ, হানিফ, টি আর ট্রাভেলস ইত্যাদি বাস সহ আরও অনেক পরিবহনের বাস সরাসরি কুয়াকাটা যায়। পদ্মা সেতু দিয়ে এখন খুব সহজেই আপনি যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব প্রায় ২৮০ কিলোমিটার।
খুলনা থেকে বাসে: খুলনা থেকে সকাল ৭ টায় একটি বিআরটিসি বাস কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এছাড়াও যেসব বাস খুলনা থেকে ছেড়ে আসে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কুয়াকাটা এক্সপ্রেস, রয়্যাল পরিবহন, সেভেন স্টার সেভেন ডিলাক্স এবং হাওলাদার পরিবহন। ভাড়া নিতে পারে ৫০০ টাকা (নন এসি) এবং সময় লাগবে আনুমানিক ৪ থেকে ৬ ঘন্টা।
উত্তরবঙ্গ থেকে বাসে: উত্তরবঙ্গ থেকে রূপসা অথবা সীমান্ত আন্তঃনগর ট্রেনে করে সৈয়দপুর থেকে খুলনা পর্যন্ত করে আসতে পারবেন। তবে রাতের ট্রেনে আসলে সবচেয়ে আলো হয়। এতে সকাল ৭ টার BRTC বাসে করে কুয়াকাটা যেতে পারবেন।
লঞ্চে: ঢাকা – পটুয়াখালী – কুয়াকাটা: সদরঘাট থেকে বেশ কিছু লঞ্চ সুন্দরবন-৯, কুয়াকাটা-১, এম ভি প্রিন্স আওলাদ-৭, কাজল-৭, সুন্দরবন-১১, এম ভি এ আর খান-১ প্রভৃতি লঞ্চ পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া নিতে পারে সিঙ্গেল কেবিন ৮০০-১০০০ টাকা, ডাবল কেবিন ১৮০০-৩৫০০ টাকা এবং ডেকের ভাড়া ২০০-৩০০ টাকা।
বি:দ্র: লঞ্চ থেকে সকালের মধ্যে পটুয়াখালী কিংবা কলাপাড়া নেমে রেন্ট-এ-কার যোগে অথবা কুয়াকাটার বাসযোগে কুয়াকাটা পৌঁছাতে পারেন। সময় লাগবে ২ঘন্টার মত, ভাড়া ১৩০-১৫০ টাকা অথবা আমতলী ঘাঁটে নেমে বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫০-৭০ টাকা ভাড়ায় কুয়াকাটা যাওয়া যাবে।
লঞ্চে: ঢাকা – ঢাকা – বরিশাল – কুয়াকাটা: সদরঘাট থেকে সন্ধ্যার পর বরিশালের উদ্দেশ্যে একাধিক লঞ্চ ছেড়ে যায়। সকালে বরিশাল পৌঁছায়। বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে রূপাতলি বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে কুয়াকাটা যাবার কোন বাসে উঠে যেতে হবে। সময় লাগবে ৩ ঘন্টার মত। ভাড়া ১৮০-২৫০ টাকা। ভাড়া নিতে পারে ডেকে ১৫০-২০০ টাকা, সিঙ্গেল ও ডাবল কেবিন ৭০০-৩,৫০০ টাকা।
বিমান: আপনি ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বরিশাল যেতে পারেন। তবে, আভ্যান্তরিন বিমান ভ্রমণের জন্য পাসপোর্টের প্রয়োজন হবে না। তাই বিমান ভ্রমণের আলাদা কোন ঝামেলা নেই। নিরাপত্তার খাতিরে শুধু আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রটি হলেই চলবে। ঢাকা থেকে বরিশাল রুটে সপ্তাহে গড়ে ১৮ টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। বিমান যোগে ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট বা তার কিছু কম/বেশি। ভাড়া হতে পারে ২,৫০০-৯,০০০ টাকা।
কোথায় খাবেন
কুয়াকাটা ভ্রমণে স্থানীয় রেস্টুরেন্টেও বিভিন্ন রকম দেশী খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া খাবার ঘর-১, খাবার ঘর-২, কলাপাড়া হোটেল, হোটেল মান্নান, হোটেল বরিশাল ইত্যাদিতে ভালো মানের খাবার পাবেন।
কোথায় থাকবেন
সাগরকন্যা হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত কুয়াকাটাতে থাকার জন্য ভালো মানের মোটেল, হোটেল রয়েছে। আধুনিক মান সম্মত হোটেল গুলোর মধ্যে রয়েছে- হোটেল নীলঞ্জনা, হোটেল বি-ভিউ, হোটেল গোল্ডেন প্যারেজ, হোটেল বীচ-ভেলী, হোটেল ফ্যামিলী হোমস, কুয়াকাটা গেষ্ট হাউজ, হোটেল সাগর কন্যা, হোটেল আল হেরা, হোটেল আকন, হোটেল সি-গার্ডেন, হোটেল স্মৃতি সহ আরো বেশ কিছু হোটেল ও মোটেল।
মান ও শ্রেনী অনুযায়ী এসব হোটেলে ৪০০-৫,০০০ টাকায় থাকতে পারবেন। তবে বাজেট ট্যুর এর ক্ষেত্রে কয়েকজন মিলে শেয়ার করে থাকলে খরচ কম হবে। সিজন ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া গেলে আগে থেকে হোটেল বুক করার প্রয়োজন পরবে না। আর অবশ্যই দামাদামি করে হোটেল বুক করবেন।
ভ্রমণ খরচের আনুমানিক ধারণা
খরচ আনুমানিক যাইহোক না কেনো তার চেয়ে অতিরিক্ত কিছু টাকা সাথে রাখবেন।
- ঢাকা-বরিশাল লঞ্চে: ডেক ২০০ টাকা, কেবিন ৭০০ – ৩,৫০০ টাকা
- ঢাকা-পটুয়াখালী লঞ্চে: ডেক ৩০০ টাকা, কেবিন ১০০০/২০০০ টাকা
- পটুয়াখালী-কুয়াকাটা বাসে: ১৪০ টাকা
- ঢাকা-কুয়াকাটা বাসে: ৬৫০ টাকা (নন-এসি), ১০০০ টাকা (এসি)
- কুয়াকাটা হোটেল: মোটামুটি মানের হোটেল ভাড়া সিঙ্গেল – ১০০০, ডাবল ১৫০০ টাকা
- মোটরসাইকেল ভাড়া: দুই দিন ৬০০ – ৮০০ টাকা
- সকালের খাবার: দুই দিন দুই বেলা, জনপ্রতি ১০০ – ২০০ টাকা
- দুপুরের খাবার: দুই দিন দুই বেলা, জনপ্রতি ৩০০ – ৪০০ টাঁকা
- রাতের খাবার: দুই দিনের রাতের খাবার, জনপ্রতি ৩০০ – ৪০০ টাকা
- অন্যান্য খরচ: ৫০০ টাকা
সব মিলিয়ে ২ দিন এর জন্য আনুমানিক খরচ হতে পারে ৬,৫০০ টাকা (বাজেট ট্যুর)।
ভ্রমণ টিপস ও সর্তকতা
- যদি আপনার ১ দিনের জন্য ট্যুর প্ল্যান থাকে তাহলে ঢাকা টেকনিক্যাল থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা বাস ভ্রমণ না করাই ভালো। আমরা ১ দিনের ভ্রমণে ২ ঘন্টা সময় পেয়েছিলাম মাত্র। যাওয়ার সময় বাস এবং আসার সময় বরিশাল লঞ্চে করে এসেছিলাম।
- ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার উত্তম পথ হল লঞ্চ। বাসে প্রায় ১২ থেকে ১৫ ঘন্টা সময় লেগে যায় কুয়াকাটা যেতে। আর লঞ্চে আপনি খুব আরামে চলে যেতে পারবেন এবং সময়ও লাগবে কম।
- কুয়াকাটা গেলে আগে থেকেই জেনে নিন কোন কারনে বন্ধ রয়েছে কিনা।
- একা হেঁটে বীচ এর অনেক দূরে চলে যাবেন না।
- দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে না খাওয়াই ভালো। কারন এখানে খাবারের মান খুব একটা ভালো না। তার উপর দাম নেয় বেশি। যদি খেতেই হয় তাহলে আগে থেকেই কোন খাবারের দাম কতো জেনে নিবেন।
- বরিশাল লঞ্চ এর খাবারের মান খুবই ভালো লেগেছে আমার। পরিবেশও ভালো। দামও তুলনামুলক কম।
- ঢাকা থেকে গেলে বেশ লম্বা জার্নি হবে। তাই শারীরিক এবং মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
- আসার সময় আমরা বরিশাল লঞ্চে করে এসেছি। লঞ্চ ছাড়ে রাত ৯ টায়। তাই লঞ্চে করে যেতে চাইলে ৯ টার ভিতরেই ঘাটে চলে আসুন। লঞ্চ ঢাকা সরঘাটে সকাল ৫ টায় ভিড়ে।
- অপরিচিত কারও দেয়া কিছু খাবেন না।
- সাথে অতিরক্ত জামাকাপড় রাখবেন।
- সমুদ্রে নামার সময় সাবধানতা অবলম্বন করুন।
- যে কোন সমস্যায় টুরিস্ট পুলিশ এর সাহায্য নিন।
কুয়াকাটা নিয়ে ভ্রমণ জিজ্ঞাসা
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য কত?
দৈর্ঘ্য: ১৮ কিলোমিটার, বিস্তৃতি: ৩ কিলোমিটার
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত কোন জেলায় অবস্থিত?
পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত কোথায় অবস্থিত?
বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আরেক নাম কি?
সাগরকন্যা
সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় কোথায়?
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত
কুয়াকাটার বিখ্যাত খাবার কি?
লেবুর চরের কাঁকড়া ভুনা এবং মহিষের দই
কুয়াকাটা অতিথি পাখি আসে কখন?
শীতকালে বিভিন্ন অতিথি পাখি দেখা যায়
কুয়াকাটা বৌদ্ধ মন্দিরের মূর্তি টির নাম কি?
গৌতম বুদ্ধের মূর্তি
বরিশালের লঞ্চ ছাড়ার সময়?
বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ার সময় রাত ৯ টা।
ফেসবুক: GoArif
