বিছনাকান্দি (Bisnakandi) সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। এখানে আপনি ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের খাঁজে থাকা সুউচ্চ ঝর্ণা উপভোগ করতে পারবেন। পাশাপাশি খাসিয়া পর্বত থেকে নেমে আসা ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে গাঁ ভিজাতে পারবেন।
| ধরন | পাথর কোয়েরি স্থান, দর্শনীয় স্থান |
| অবস্থান | গোয়াইনঘাট, সিলেট |
| সিলেট শহর থেকে দূরত্ব | প্রায় ৪০ কিলোমিটার |
| ঢাকা থেকে দূরত্ব | প্রায় ২৭৪ কিলোমিটার |
| ড্রোন উড়ানো যাবে | হ্যাঁ |
| জনপ্রতি প্রবেশ ফি | ফ্রি |
| খোলা থাকে | সবসময় |
| ভ্রমণের উপযুক্ত সময় | বর্ষায় |
কি কি দেখবেন
চোখ জুড়ানো বিছনাকান্দি মূলত জাফলং ও ভোলাগঞ্জের মতই একটি পাথর কোয়ারির স্থান। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে এসে বিছনাকান্দিতে এসে মিলিত হয়েছে। তাছাড়া মেঘালয় পাহাড়ের খাঁজে থাকা সুউচ্চ ঝর্ণা বিছনাকান্দির প্রকৃতিকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা যা, আপনাকে করবে বিমোহিত। আপনার চোখ জুড়াতে বাধ্য। বিছনাকান্দিতে প্রধান আকর্ষন হচ্ছে পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলধারা আর পাহাড়ে পাহাড়ে শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি! এ যেন পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর পাথর মিলিয়ে প্রাকৃতিক মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে আপনার জন্য।
ভ্রমণের এই স্থান টি সিলেট শহর থেকে বেশখানিক পথ দূরে অবস্থিত। বিছনাকান্দির এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পাথর আর পাথর। কিছু পাথর একেবারে স্বচ্ছ আবার পানির জন্য কিছু পাথর অনেক পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে।
মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানিতে পা ফেলে মনে হবে পৃথিবীর সব শান্তি মনে হয় এখানেই রয়েছে। আপনি চাইলে ঝর্ণার বয়ে আসা পানিতে গাঁ ভেজাতে পারবেন। এখানে বয়ে আসা পানি খুবই ঠান্ডা। পানির নিচে থাকা পাথর পিচ্ছিল। তাই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। স্বচ্ছ শীতল পানির তলদেশে পাথরের পাশাপাশি নিজের শরীরের লোমও দেখা পাবেন স্পষ্ট। এখানে আপনি দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত শুধু পাথর আর পাহাড় দেখতে পাবেন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে আকাশ আর মেঘের সাথে পাহাড় মিশে আছে। এককথায় বলতে গেলে পাথর, পানি, পাহাড় আর মেঘ নিয়েই যেন বিছনাকান্দি।
আরও: জাফলং
ভ্রমণের সেরা সময়
বিছনাকান্দি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। অন্যান্য সময় গেলেও বিছানাকান্দি উপভোগ করতে পারবেন তবে, বর্ষার সময়ে বিছনাকান্দি পূর্ণযৌবন ফিরে পায়। তাই বর্ষার সময় গেলে বেশি উপভোগ করতে পারবেন।
কিভাবে যাবেন
আপনি যেখান থেকেই ভ্রমণে আসেন না কেনো বিছনাকান্দি যেতে হলে প্রথমে আপনাকে সিলেট জেলা শহরে আসতে হবে। তারপর সিলেট থেকে বিছনাকান্দি যেতে হবে। আসুন বিছনাকান্দি যাওয়ার উপায় নিয়ে বিস্তারিত জানা যাক।
বাসে: আপনি ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা প্লেনে সিলেট যেতে পারবেন। ঢাকা থেকে সিলেট এর উদ্দেশ্যে বেশ কিছু এসি/নন-এসি বাস ছেড়ে যায়। গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বাস গুলো সকাল থেকে রাত ১২.৪৫ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় পরপর ছেড়ে যায়৷ ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকেও সিলেটের বাস যায়।
গ্রীন লাইন পরিবহন, সৌদিয়া এস আলম পরিবহন, শ্যামলি পরিবহন ও এনা পরিবহনের এসি বাস চলাচল করে। ১৪০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা। নন-এসি বাসের জনপ্রতি টিকেটের মূল্য ৬৮০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা নিতে পারে।
ট্রেনে: ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস। এছাড়া, সপ্তাহের প্রতিদিন দুপুর ২টার দিকে ছাড়ে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ০৯টা ৫০ মিনিটে উপবন এক্সপ্রেস কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে যায়। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৪টায় ছাড়ে কালনী এক্সপ্রেস। ট্রেনে যেতে সময় লাগবে সাড়ে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা। ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা হতে পারে।
পরামর্শ: আপনার যদি ট্রেন ভ্রমণ ভালো লাগে তাহলে রাত ৯:৫০ মিনিটের উপবন এক্সপ্রেসে জাওয়াটাই সব থেকে ভালো হতে পারে। কারন, আপনার যেতে যেতে সকাল হয়ে যাবে আর আপনি যদি রাতে ট্রেনে ঘুমিয়ে নেন তাহলে, সকালে ট্রেন থেকে নেমেই আপনার ভ্রমন শুরু করতে পারেন।
প্লেনে: ঢাকা থেকে আপনি সিলেট প্লেনে যেতে পারেন। এতে আপনার সময় লাগবে ১ ঘণ্টার মত। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেশ কিছু ডোমেস্টিক ফ্লাইট ছেড়ে যায়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, নভো এয়ার, ইউএস বাংলা এয়ার, এয়ার এস্ট্রা সহ বেশ কিছু বিমান প্রতিদিন সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে সিলেট যেতে শ্রেণিভেদে টিকেট মূল্য ৩,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
চট্টগ্রাম থেকে: আপনি চাইলে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে সিলেট ভ্রমণ করতে পারবেন। চট্টগ্রাম থেকে সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস এবং শনিবার ছাড়া প্রতিদিন রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে উদয়ন এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়। ১৪৫ টাকা থেকে ১১০০ টাকা হতে পারে।
সিলেট থেকে: সিলেট থেকে বিছনাকান্দি যেতে প্রথমে সিলেটের আম্বরখানার সিএনজি স্টেশন থেকে জনপ্রতি ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় লোকাল সিএনজিতে চড়ে হাদারপার নামক জায়গায় যেতে হবে। সারাদিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ নিলে সাধারণত ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকার নিতে পারে। অবশ্যই দামাদামি করে নিবেন।
হাদারপার এসে নৌকা ঘাট থেকে নৌকা ঠিক করে বিছনাকান্দির মেইন পয়েন্টে যেতে পারবেন। তবে, এখানে নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করার সময় অবশই দামাদামি করে নিবেন। আপনি চাইলে নৌকা বা ট্রলার রিজার্ভ নিতে পারেন অথবা অন্য ভ্রমণকারীদের সাথে ভাড়া শেয়ার করে যেতে পারেন। শুধু বিছনাকান্দি যাওয়ার জন্য নৌকা ভাড়া লাগবে ৮০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা নিতে পারে। আর পান্থুমাই সহ নৌকা ভাড়া লাগবে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা। ছোট/বড় ট্রলার ভেদে ভাড়া কম বেশি হতে পারে।
নোট: বিছনাকান্দিতে গোসল করলে পোষাক পরিবর্তনের প্রয়োজনে অর্থের বিনিময়ে ওয়াশরুম ব্যবহার করা যায়।
আরও: পান্থুমাই ঝর্ণা
কোথায় খাবেন
এখানে কিছু অস্থায়ী খাবারের হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলে বিভিন্ন প্যাকেজে আনলিমিটেড ভাত ডাল খেতে পারবেন মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। সাথে কিছু শুকনো খাবার, পানি ইত্যাদি নিয়ে নিবেন। হাদারপার বাজারে গনি মিয়ার ভূনা খিচুড়ি খেতে পারেন।
এছাড়া সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে, আপনার চাহিদামত সবকিছুই পাবেন সেখানে। সিলেটের জিন্দাবাজার এলাকার জনপ্রিয় পানসী, পাঁচ ভাই কিংবা পালকি রেস্টুরেন্টের সুলভ মূল্যে পছন্দমত দেশী খাবার খেতে পারেন, এই রেস্টুরেন্ট গুলোতে অনেক রকম ভর্তা ভাজি, খিচুড়ি ও মাংস পাবেন।
কোথায় থাকবেন
একদিনে আপনি বিছানাকান্দি ভ্রমণ করে আসতে পারবেন তাই, যাওয়া আসার সময় কম লাগার কারণে থাকার জন্য সিলেট শহরকে বেছে নিতে পারেন। সিলেট শহরে আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ অনুযায়ী প্রচুর হোটেল পেয়ে যাবেন। এছাড়া লালা বাজার এলাকায় ও দরগা রোডে কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে৷
এছাড়া, তামাবিল/জৈন্তাপুরের দিকে বেশ কিছু রিসোর্ট রয়েছে। আপনার থাকার ব্যবস্থা যদি এইদিকে কোথাও হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে হাদারপাড় থেকে আবার আগের মতই গোয়াইনঘাটে আসতে হবে। গোয়াইন ঘাট থেকে যেতে হবে সারি ঘাট। সিএনজি বা লেগুনাতে করে যেতে পারবেন। ভাড়া নিতে পারে জনপ্রতি ৬০টাকা।
টিপস ও সতর্কতা
- আপনি চাইলে একদিনে রাতারগুল দেখে বিছনাকান্দি ভ্রমণ করে আসতে পারবেন।
- ভ্রমণের পূর্বে আপনার প্রয়োজনীয় জামাকাপড়, ক্যামেরা, চার্জার, ব্রাশ ইত্যাদি ব্যাগে ঘুছিয়ে নিন।
- পানিতে নামার জন্য বা গোসল করার জন্য সাথে অতিরিক্ত কাপড় নিয়ে নিন।
- খরচ কমাতে চাইলে দলগত ভাবে ভ্রমণ করতে পারেন।
- নৌকা বা সিএনজি ভাড়া করার সময় ভালো মত দামাদামি করে নিন।
- বিছনাকান্দিতে পানিতে নামার সময় সতর্ক থাকুন। কারণ, এখানের পাথর অনেকটা পিচ্ছিল এবং সাতার না জানলে পানির গভীরে যাবেন না।
- পানিতে নামার সময় সাথে থাকে ক্যামেরা, ব্যাগ, জামাকাপড় ইত্যাদি নিরাপদ স্থানে রাখুন।
- বর্ষাকালে অল্প পানির স্রোতের গতি অনেক বেশি থাকে তাই, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
- বর্ডারের খুব কাছে যাবেন না।
- এখানে সন্ধ্যার সময় না থাকাই উত্তম তাই সন্ধ্যার পূর্বেই সিলেট শহরে ফিরে আসুন।
- এখানে ক্যামেরাম্যান আপনার ছবি তুলে দিতে চাইবে। ছবি তোলার অনুমতি দেয়ার আগে তিনি কেমন ছবি তুলতে পারেন তা আগে দেখে নিন।
- অতিরিক্ত ছবি তোলা এবং ভিডিও করতে গিয়ে আসল সৌন্দর্য্য দেখতে ভুলবেন না।
বিছনাকান্দি নিয়ে ভ্রমণ জিজ্ঞাসা
বিছানাকান্দি নৌকা ভাড়া কত?
শুধু বিছনাকান্দি যাওয়ার জন্য নৌকা ভাড়া লাগবে ৮০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা নিতে পারে। আর পান্থুমাই সহ নৌকা ভাড়া লাগবে ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা। ছোট/বড় ট্রলার ভেদে ভাড়া কম বেশি হতে পারে।
জাফলং থেকে বিছানাকান্দি কত কিলোমিটার?
জাফলং থেকে বিছানাকান্দি প্রায় ৩০ কিলোমিটার।
ভোলাগঞ্জ থেকে বিছানাকান্দি কত কিলোমিটার?
ভোলাগঞ্জ থেকে বিছানাকান্দি প্রায় ২১ কিলোমিটার।
বিছনাকান্দি এর হোটেল ভাড়া কত?
সিলেট শহরে আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ অনুযায়ী প্রচুর হোটেল পেয়ে যাবেন। এছাড়া লালা বাজার এলাকায় ও দরগা রোডে কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে৷ হোটেলে থাকতে খরচ হবে ২,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া লাক্সারী হোটেল ও রিসোর্টের মধ্যে আছে নিরভানা ইন, হোটেল নূরজাহান গ্র্যান্ড, রোজ ভিউ হোটেল, নাজিমগর রিসোর্ট, গ্র্যান্ড প্যালেস সহ আরও বেশ কিছু হোটেল। প্রতি রাতের জন্যে আপনাকে গুনতে হবে ৮,০০০ টাকা থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
ফেসবুক: GoArif
