পানাম নগর (Panam City), বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলায় অবস্থিত। পুরনো এই নগরটি সোনারগাঁও এর ২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত এবং ৪৫০ বছরের পুরনো বাংলার প্রথম রাজধানী এবং ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড এর তালিকায় পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংস প্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি।
বাংলাদেশীদের কাছে পানাম সিটি “হারানো নগরী” হিসাবে সুপরিচিত। সোনাগাঁওয়ে ঈসা খাঁ প্রায় ১৫ শতকের দিকে বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। পানাম বাংলার প্রাচীনতম শহর। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড এর তালিকায় পৃথিবীর ১০০টি ধ্বংস প্রায় ঐতিহাসিক শহরের একটি পানাম নগর বা এই পানাম সিটি। ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ এর আমলে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয় সুবর্ণ গ্রামকে, যা পরে সোনারগাঁ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
আরও: বাংলার তাজমহল
| ধরন | ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর |
| অবস্থান | সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ |
| স্থাপিত | ১৫ শতক |
| বাড়ির সংখ্যা | ৫২টি |
| উচ্চতা | ১ তলা থেকে ৩ তলা |
| কারিগর | মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা |
| পুকুর | ৪টি |
| ঢাকা থেকে দূরত্ব | ৩০ কিলোমিটার (প্রায়) |
| প্রবেশ মূল্য | ১৫ টাকা |
এখানে এক সময় ধনী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের বসবাস ছিল। ছিল মসলিনের জমজমাট ব্যবসা। ব্যবসার জন্য এই স্থানটি খুবই প্রসিদ্ধ ছিল। পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা এবং পূর্বে মেঘনা নদী পথে বিলেত থেকে এখানে বিলাতি থানকাপড় ব্যবসার জন্য বিক্রিয় করতে নিয়ে আসতো। আবার এখান থেকে তারা বিখ্যাত মসলিন কাপড় নিয়ে যেতো। ঠিক ঐসময়ই ইউরোপীয়দের অনুপ্রেরণায় বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে পানাম নগরীতে নতুন ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতি গড়ে উঠে।
ইংরেজদের নীল বাণিজ্যের কথা মনে আছে আপনাদের? একসময় বাংলার কৃষকদের উপর নীল চাষের জন্য অত্যাচার করত এই ইংরেজরা। তারাই একসময় পানাম নগরীতে গড়ে উঠা কাপড়ের বাণিজ্য দখল করে নেয় এবং এখানে নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে শুরু করে। মজার বিষয় বিষয় হচ্ছে, ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার এর মতে সুলতানী আমলে পানাম সিটি ছিলো নাকি সোনারগাঁর রাজধানী! কিন্তু পানাম নগরীতে সুলতানী আমলের তেমন কোন স্থাপত্য নজরে পড়েনি কারো। তাই তাদের এই দাবির সত্যতা সঠিক প্রমাণিত হয়নি।
কি কি দেখবেন
পানাম নগর এর ভিতরে প্রবেশের জন্য ছোট একটি লোহার গেইট রয়েছে। কিছুটা হেটে সামনে গেলে বা’দিকে রয়েছে টিকিট কাউন্টার আর চোখে পরবে পানাম সিটির ২/৩ তলা বিশিষ্ট উচু উচু বাড়ি। পানাম নগরে ঢুকেই আপনার চোখে পড়বে একটি সরু চিকন রাস্তার ধারে সারি সারি পুরনো দালান। দালান গুলো কোনটা ২তলা আবার কোনটা ১তলা বিশিষ্ট। বাড়িগুলোর স্থাপত্য নিদর্শন দেখেই বুঝতে পারবেন এখানে যে ধনী শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করতেন।
পানাম সিটির বাড়ি গুলো মোঘল ও গ্রীক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণ দেখা যায় এবং প্রত্যেকটি বাড়ি সুন্দর কারুকাজ করা। তাছারা এখানের কারুকার্য করা বাড়ি গুলোর নির্মাণকৌশলের দিক থেকে চমৎকার উদ্ভাবনী কৌশলের প্রমাণ মিলে। এখানে তৈরি বাড়ি গুলোতে ঢালাই লোহার তৈরি ব্রাকেট ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায়। তাছারা জানালায় ব্যবহার করা হয়েছে লোহার গ্রিল, ইউরোপে ব্যবহৃত কাস্ট আয়রনের কাজ, মেঝেতে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ লক্ষ্য করা যায়।
পানাম নগরে সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি নিয়ে মোট ৫২ টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া আরও রয়েছে সজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর এবং ৪০০ বছরের পুরনো টাকশাল বাড়ি। এখানে ৫২টি বাড়ির প্রত্যেকটি একটি থেকে আরেকটি নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত। বাড়ি গুলো বহির্বাটী এবং অন্যটি অন্দর-বাটি এই দুই ভাগে বিভক্ত এবং বাড়ির সামনে উন্মুক্ত উঠান রয়েছে।
সময়সূচি ও প্রবেশ মূল্য
পানাম নগরের সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার। আর সোমবার অর্ধদিবস খোলা (দুপুর ১:৩০ থেকে বিকাল ৫ পর্যন্ত) খোলা থাকে। সপ্তাহের বাকি দিন গুলো সকাল ৮ থেকে সন্ধ্যা ৭ পর্যন্ত খোলা থাকে।
পানাম সিটির প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। আর আপনি যদি জাদুঘরে প্রবেশ করতে চান তাহলে জনপ্রতি ৫০ টাকা টিকিট কাটতে হবে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে পানাম সিটি এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। যা সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর থেকে ১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নারায়ণগঞ্জ জেলার মোগরাপাড়া পয়েন্টে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তরে প্রায় ২.৫ কিলোমিটার অদূরে সোনারগাঁও থানার একটি নিকটতম শহর।
আপনাকে ঢাকা গুলিস্তান থেকে স্বদেশ, বোরাক, দোয়েল ও সোনারগাঁ নামক বাসে উঠে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নামতে হবে। মোগরাপাড়া থেকে লোকশিল্প জাদুঘরের দূরত্ব প্রায় ২ কিলোমিটার। চাইলে রিক্সা অথবা সিএনজি তে করে যেতে পারেন। এছাড়া নিজস্ব পরিবহণ থাকলে সেটা দিয়েও যেতে পারেন। কারন যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। গুলিস্তান থেকে ভাড়া নিতে পারে ৫০ হতে ১০০ টাকা।
কোথায় থাকবেন
আপনি যদি ঢাকার আশপাশ থেকে ভ্রমণে আসেন তাহলে ১ দিনেই পানাম সিটি ভ্রমণ করে চলে যেতে পারবেন। তবে যদি দূর থেকে এখানে আসেন তাহলে আপনার থাকার জন্য এখানে খুব ভালো মানের হোটেল রয়েছে। যেমন, সোনারগাঁও রয়েল রিসোর্ট, হোটেল মেহেরান, হোটেল সোনালী, হোটেল সুগন্ধা।
টিপস ও সতর্কতা
- পানাম নগরের প্রত্যেকটি ভবন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ তাই নির্দেশনা অমান্য করে কোন ভবনের উপরে উঠবেন না। (আমরা ভ্রমণে গিয়ে দেখেছি যে, একজন নির্দেশনা অমান্য করে ভবনে উঠার পর নিচে পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছেন)
- ভ্রমণে অবশ্যই সাথে করে খাবার পানি নিয়ে নিবেন।
- কোন ভবনের ভিতরে বেশীক্ষণ থাকবেন না। কারন, ভিতরটা অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে এবং গোমটবাঁধা। এতে বেশীক্ষণ থাকলে শরীরে এলার্জি শুরু হয়ে যেতে পারে।
- জনমানব শূন্য স্থানে বেশিক্ষণ একা থাকবেন না।
- সন্ধ্যার পর এখানে না থাকাই ভালো।
- প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করবেন না।
- ভিতরে প্রস্রাব বা পায়খানা করার মতো জঘন্য কাজ করবেন না।
- প্রস্রাব বা পায়খানা করার জন্য আলাদা টয়লেট রয়েছে সেটা ব্যবহার করুন।
- টিকিট সংগ্রহ না করে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করবেন না।
- বৃষ্টির সময় সঙ্গে ছাতা রাখুন অথবা রেইনকোট রাখুন।
- ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের নিচে বসবেন না।
- ক্যামেরা, মানিব্যাগ যাবতীয় জিনিস নিজের সঙ্গে রাখুন।
- ছবি তোলার সময় ব্যাগ বা সঙ্গে থাকা কোন কিছু পাশে রাখলে সেটার প্রতি খেয়াল রাখুন।
আশেপাশের আরও দর্শনীয় স্থান
হাতে সময় থাকলে আশেপাশের আরও দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসতে পারেন।
পানাম নগর নিয়ে প্রশ্ন-উত্তর
পার্কিং ব্যবস্থা আছে কি?
হ্যাঁ, জাদুঘরের সাথেই আছে পার্কিং স্থান। এখান থেকে পানাম সিটি খুব কাছেই। চাইলে হেঁটেই যেতে পারবেন।
পানাম নগর টিকেট মূল্য কত?
পানাম সিটির প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। আর আপনি যদি জাদুঘরে প্রবেশ করতে চান তাহলে জনপ্রতি ৫০ টাকা টিকিট কাটতে হবে।
পানাম নগর সাপ্তাহিক বন্ধ কবে?
পানাম নগরের সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার।
ফেসবুক: GoArif
