বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের নাম হচ্ছে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত (Cox’s Bazar Sea Beach)। কল্পনা করুন, সূর্য ওঠার সাথে সাথে সমুদ্রের পানি সোনালি হয়ে উঠছে, অসীম বালুকাবেলিতে পা রেখে হাঁটছেন, একপাশে বিশাল নীল সমুদ্র আরেক পাশে সবুজ পাহাড়, আর মাথার উপর পরিষ্কার নীল আকাশ, এটাই কক্সবাজার! বাংলাদেশের গর্ব, প্রকৃতির এক অপরূপ উপহার।
বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর একটি। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সৈকত হিসেবে স্বীকৃত। সোনালি বালুকাবেলি, ফিরোজা নীল পানি, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য, সতেজ সামুদ্রিক বাতাস সবকিছু মিলিয়ে কক্সবাজার এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়।
প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ পর্যটক এই সৈকতে ভিড় জমান। শুধু দেশীয় পর্যটকই নয়, বিদেশি ভ্রমণকারীরাও কক্সবাজারের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। ২০০ মিটার চওড়া (জোয়ারের সময়) থেকে ৪০০ মিটার চওড়া (ভাটার সময়) এই বিশাল সৈকত যেন প্রকৃতির এক খোলা ক্যানভাস, যেখানে সমুদ্র আর আকাশ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
আরও: ইনানী সমুদ্র সৈকত
কক্সবাজারে কী কী দেখবেন
লাবনী বিচ
লাবনী পয়েন্ট হচ্ছে কক্সবাজারের সবচেয়ে জমজমাট জায়গা। এখানে সবসময় মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। সৈকতে ঘোড়ায় চড়া, তিন চাকার বিচ বাইক চালানো, সমুদ্রে নামা, ভলিবল খেলা কত কী করার সুযোগ আছে এখানে।
সন্ধ্যায় লাবনী বিচে বসে সূর্যাস্ত দেখা মানে একেবারে অন্য রকম এক অনুভূতি। চারপাশে অসংখ্য খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ আর স্ট্রিট ফুডের স্টল। তাজা ডাবের পানি, ঝালমুড়ি, সামুদ্রিক খাবার যা চান তাই পাবেন। রাতে পুরো এলাকা রঙিন আলোয় সেজে ওঠে, দেখতে ভারি সুন্দর লাগে।
কলাতলী বিচ
কলাতলী পয়েন্ট লাবনী থেকে একটু শান্ত। পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য দারুণ জায়গা। এখানে অনেক ভালো ভালো হোটেল আর রিসোর্ট আছে। সায়েমান বিচ রিসোর্ট থেকে শুরু করে নানা রকমের থাকার জায়গা পাবেন এই এলাকায়।
সৈকত এখানে বেশ চওড়া, তাই সমুদ্রে নামতে সুবিধা। ডলফিন চত্বর এই এলাকার একটা পরিচিত জায়গা। এখান থেকে সব জায়গায় যাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া যায় সহজেই।
সুগন্ধা পয়েন্ট
সুগন্ধা পয়েন্টে আছে বিখ্যাত বার্মিজ মার্কেট। মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র, লংগি, থানাকা, মুক্তার গহনা, হাতের কাজের জিনিস এসব কিনতে চাইলে এখানে আসতে হবে।
সুগন্ধা বিচ একটু কম ভিড়ের জায়গা। শান্ত পরিবেশে সমুদ্রের ধারে হাঁটতে চাইলে এটা বেস্ট। এখানে ফ্লাই ডাইনিং রেস্তোরাঁও আছে যেখানে সমুদ্রের পাশে বসে খাওয়া-দাওয়া করা যায়।
ইনানী বিচ
কক্সবাজার থেকে ২২-২৫ কিলোমিটার দূরে ইনানী বিচ। এটা সত্যিই অসাধারণ সুন্দর আর মানুষও কম থাকে। এখানে সমুদ্রের পানি অনেক বেশি নীল আর স্বচ্ছ।
ইনানীর বিশেষত্ব হলো প্রবাল পাথর। ১৮ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতে কালো আর সবুজ রঙের প্রবাল পাথর দেখা যায়, বিশেষ করে বর্ষায় আর গরমকালে। ছবি তুলতে আর প্রকৃতি উপভোগ করতে চাইলে ইনানী মিস করবেন না। এখানে কয়েকটা ভালো রিসোর্টও আছে যেখানে থাকতে পারবেন। শান্ত পরিবেশে সমুদ্র দেখতে চাইলে ইনানী হচ্ছে পারফেক্ট জায়গা।
হিমছড়ি
কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান। এখানে পাহাড়, জঙ্গল আর সমুদ্র তিনটা একসাথে মিলেছে। হিমছড়ির মূল আকর্ষণ হচ্ছে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা।
বর্ষাকালে ঝর্ণার পানি বেড়ে যায়, তখন দৃশ্যটা আরও মনোমুগ্ধকর হয়। হিমছড়িতে পাহাড়ে উঠতে পারবেন, ট্রেকিং করতে পারবেন। এখানকার পিকনিক স্পট আর ভিউপয়েন্ট থেকে বঙ্গোপসাগরের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। ভাগ্য ভালো থাকলে বন্যপ্রাণী আর পাখিও দেখতে পাবেন।
মেরিন ড্রাইভ রোড
৮০ কিলোমিটার লম্বা মেরিন ড্রাইভ রোড কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত চলে গেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর সড়কগুলোর একটা এটা। এক পাশে সবুজ পাহাড়, আরেক পাশে নীল সমুদ্র ড্রাইভ করতে করতে মন ভরে যায়।
মেরিন ড্রাইভে গাড়ি বা বাইক ভাড়া করে ঘোরাটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা। মাঝে মাঝে থেমে ছবি তুলতে পারবেন, সমুদ্রের পাশে বসে চা খেতে পারবেন। এই রাস্তা ধরেই ইনানী, হিমছড়ি আর টেকনাফ যাওয়া যায়। সূর্যাস্তের সময় এই রাস্তায় ড্রাইভ করা মানে একেবারে স্বর্গীয় অনুভূতি।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ
কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন যেতে হয় টেকনাফ হয়ে। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এটা। স্ফটিক স্বচ্ছ পানি, নারকেল গাছ, প্রবাল দ্বীপের সৌন্দর্য দেখার মতো।
টেকনাফ থেকে জাহাজে করে প্রায় ২-৩ ঘণ্টা লাগে সেন্ট মার্টিন পৌঁছাতে। ডে ট্রিপে যাওয়া যায়, তবে রাতে থাকলে আরও মজা পাবেন। দ্বীপে স্নরকেলিং করা যায়, সামুদ্রিক জীবন দেখা যায়। রাতে সৈকতে বসে তারা দেখা মানে অন্য রকম এক অনুভূতি। সেন্ট মার্টিন একদম শান্ত, নির্জন আর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার জায়গা।
রাডার স্টেশন
কক্সবাজার শহর থেকে একটু দূরে রাডার স্টেশন বলে একটা জায়গা আছে পাহাড়ের উপরে। এখান থেকে পুরো কক্সবাজার শহর আর সমুদ্র দেখা যায়। সূর্যোদয় দেখার জন্য এটা দারুণ জায়গা।
সকাল সকাল উঠে রাডার স্টেশনে গেলে সূর্যোদয়ের অপূর্ব দৃশ্য দেখতে পাবেন। পুরো শহর জেগে ওঠে, সমুদ্রে আলো পড়তে শুরু করে দৃশ্যটা মনে রাখার মতো। এখানে যেতে হলে জিপ ভাড়া করতে হয়।
আগ্গমেদা খিয়াং
বৌদ্ধ মন্দির দেখতে চাইলে আগ্গমেদা খিয়াং যেতে পারেন। এটা কক্সবাজারের অন্যতম পুরনো বৌদ্ধ মন্দির। মন্দিরের স্থাপত্য দেখার মতো, ভেতরে বড় বড় বুদ্ধমূর্তি আছে।
এখানে একটা শান্ত পরিবেশ। মন্দিরের চারপাশে সবুজ বাগান। বৌদ্ধ সংস্কৃতি আর ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন এখানে। স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষরা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ, তাদের সাথে কথা বলতে পারবেন।
আরও: কক্সবাজারে দেখার জন্য সেরা ১০টি স্থান
কক্সবাজার ভ্রমণের সেরা সময়
শীতকাল (নভেম্বর – ফেব্রুয়ারি) – সেরা সময়
কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময়টায় আবহাওয়া থাকে দারুণ আরামদায়ক। তাপমাত্রা ১৮-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, আর্দ্রতা কম থাকে, বৃষ্টিও হয় না বললেই চলে।
এই মৌসুমে আকাশ থাকে পরিষ্কার, সমুদ্র থাকে শান্ত। সমুদ্র স্নান করতে, সূর্যাস্ত দেখতে, বিচে হাঁটতে সব কিছুর জন্যই পারফেক্ট। তবে এই সময়টা পিক সিজন হওয়ায় পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। হোটেল আর রিসোর্টের দাম একটু বেশি হয়, তাই আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখা ভালো। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে স্থানীয় উৎসবও হয়, তখন আরও বেশি মজা পাবেন।
বসন্ত (মার্চ – এপ্রিল) – মোটামুটি ভালো
মার্চ আর এপ্রিলে কক্সবাজারে গরম পড়তে শুরু করে। তাপমাত্রা ২৫-৩২ ডিগ্রিতে থাকে। পর্যটক শীতের চেয়ে কম থাকে, তাই হোটেলের দামও কিছুটা কম।
এই সময়টায় সৈকত কম জনাকীর্ণ থাকে, শান্তিতে ঘোরাফেরা করা যায়। তবে দুপুরের দিকে গরম লাগে, তাই সকাল-সন্ধ্যায় বাইরে বের হওয়া ভালো। হালকা পোশাক আর সানস্ক্রিন সাথে রাখবেন। বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য এই সময়টা বেশ ভালো।
বর্ষাকাল (মে – অক্টোবর) – অফ সিজন
মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকাল। এই সময় প্রচুর বৃষ্টি হয়, সমুদ্র থাকে উত্তাল। আর্দ্রতা থাকে ৮০-৮৫ শতাংশ, যা বেশ অস্বস্তিকর।
তবে বর্ষায় কক্সবাজারের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। চারপাশ সবুজে ভরে যায়, মেঘের খেলা দেখা যায়, সমুদ্রের ঢেউ দেখতে রোমাঞ্চকর লাগে। হিমছড়ির ঝর্ণা তখন পূর্ণ যৌবনে থাকে। হোটেল আর রিসোর্টের দাম অনেক কম, মনসুন প্যাকেজ পাওয়া যায়। তবে সমুদ্রে নামা একটু বিপজ্জনক হতে পারে, সাবধানে থাকতে হয়। প্রকৃতিপ্রেমীরা এই সময়টায় যেতে পারেন।
আরও: পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত
কীভাবে যাবেন
বিমানে
ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার সবচেয়ে দ্রুত উপায় হচ্ছে বিমান। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স নিয়মিত ফ্লাইট চালায়। ফ্লাইটে সময় লাগে মাত্র ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা।
পিক সিজনে (নভেম্বর-মার্চ) প্রায় প্রতিদিনই ফ্লাইট থাকে। অফ সিজনে সপ্তাহে ৩-৪ দিন। টিকিটের দাম সাধারণত ৪,০০০-৮,০০০ টাকার মধ্যে, সিজন অনুযায়ী ওঠানামা করে। আগে থেকে বুক করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে শহর মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার দূরে। এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি বা হোটেল শাটল পাওয়া যায়।
ট্রেনে
ঢাকা থেকে কক্সবাজার সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে। “কক্সবাজার এক্সপ্রেস” নামে ট্রেনটি ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে কক্সবাজার পৌঁছায়। যাত্রায় সময় লাগে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা।
ট্রেনে ভ্রমণ মোটামুটি আরামদায়ক আর সাশ্রয়ী। এসি বার্থ, স্নিগ্ধা, শোভন নানা ক্লাসের টিকিট পাওয়া যায়। দাম ৫০০-২১৫০ টাকার মধ্যে, ক্লাস অনুযায়ী। তবে টিকিট পাওয়া কঠিন, কারণ অনেক আগে থেকেই বুক হয়ে যায়। পিক সিজনে তো টিকিট পাওয়াই দুষ্কর। অনলাইনে আগে থেকে বুকিং দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
বাসে
ঢাকা থেকে কক্সবাজার বাসে যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ উপায়। অনেকগুলো বাস কোম্পানি এই রুটে চলে গ্রীনলাইন, শ্যামলী, হানিফ, সৌদিয়া, ইউনিক এরকম অনেক।
এসি আর নন-এসি দুই ধরনের বাস পাওয়া যায়। নন-এসি বাসের ভাড়া ৪০০-১২০০ টাকা, এসি বাসে (স্লিপার কোচ সহ) ৮০০-৩০০০ টাকা। যাত্রায় সময় লাগে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা, ট্রাফিক আর রাস্তার অবস্থার উপর নির্ভর করে। ঢাকার সায়েদাবাদ, কলাবাগান, ফকিরাপুল থেকে বাস ছাড়ে। রাতের বাসে গেলে সকালে কক্সবাজার পৌঁছানো যায়। আরামদায়ক আসন আর ভালো সার্ভিসের জন্য স্লিপার কোচ বা এসি চেয়ার কোচ নেওয়া ভালো।
ব্যক্তিগত গাড়িতে
নিজের গাড়ি বা গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে কক্সবাজার প্রায় ৩৯০-৪০০ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম হয়ে যেতে হয়। পথে সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে, মাঝে মাঝে থেমে বিরতি নিতে পারবেন।
নিজের গাড়িতে গেলে স্বাধীনতা বেশি থাকে, নিজের ইচ্ছেমতো যাওয়া-আসা করা যায়। তবে দীর্ঘ ড্রাইভে ক্লান্তি আসতে পারে। দুইজন ড্রাইভার থাকলে ভালো, একজন ক্লান্ত হলে আরেকজন গাড়ি চালাতে পারবে। পথে পেট্রল পাম্প, খাবারের হোটেল, রেস্টহাউজ পাওয়া যায়।
আরও: কক্সবাজারের সবচেয়ে সুন্দর বিচ কোনটি
কোথায় থাকবেন
লাক্সারি রিসোর্ট (৫,০০০-১৫,০০০ টাকা/রাত)
- সায়েমান বিচ রিসোর্ট: কক্সবাজারের সবচেয়ে নামকরা রিসোর্টগুলোর একটা। সমুদ্রের একদম পাশে। সুইমিং পুল, স্পা, জিম, একাধিক রেস্তোরাঁ সব আছে।
- সি পার্ল বিচ রিসোর্ট: এখানে ফুল-সার্ভিস স্পা আছে, রুম সার্ভিস চমৎকার। সমুদ্রমুখী কক্ষে বসে সূর্যাস্ত দেখা যায়।
- লং বিচ হোটেল: ৪.৫ তারকা হোটেল। বিজনেস ট্রাভেলার আর পরিবারের জন্য উপযুক্ত। কনফারেন্স রুম, বিজনেস সেন্টার আছে। বাচ্চাদের জন্য আলাদা পুল আর গেম রুম।
- ওশান প্যারাডাইজ রিসোর্ট: লাক্সারি ভিলা টাইপের রিসোর্ট। প্রাইভেসি বেশি চাইলে এখানে থাকতে পারেন।
মিড-রেঞ্জ হোটেল (২,০০০-৫,০০০ টাকা/রাত)
- হোটেল দ্য কক্স টুডে: লাবনী বিচ থেকে হেঁটে যাওয়া যায়। সি ভিউ আর পুল ভিউ দুই ধরনের রুম আছে। থাই স্পা, জিম, সুইমিং পুল সব সুবিধা আছে।
- বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজ: ভালো কোয়ালিটির হোটেল। স্পা সুবিধা চমৎকার। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ভালো।
- হোটেল সি কুইন: সুগন্ধা বিচের কাছে। বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য ভালো অপশন।
- প্রাইম পার্ক হোটেল: কলাতলীতে অবস্থিত। রুম সাইজ ভালো, খাবারের মান চমৎকার।
বাজেট হোটেল (৮০০-২,০০০ টাকা/রাত)
- হোটেল উইন্ডি টেরেস: কলাতলীতে। পরিষ্কার রুম, ভালো সার্ভিস। খাবারের মান চমৎকার। স্পা আর ম্যাসাজ সুবিধা আছে।
- ইউনি রিসোর্ট: তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়। বিচ থেকে ৫-৬ মিনিট হাঁটা। দাম কম, সুবিধা ভালো।
- হোটেল সি কক্স: সুগন্ধা বিচের একদম কাছে। বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য আদর্শ।
- হোয়াইট অর্কিড: বাস টার্মিনাল থেকে খুব কাছে। পরিবারের জন্য ভালো। রুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
কোথায় খাবেন
কক্সবাজার মানেই সামুদ্রিক খাবারের স্বর্গ। তাজা মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, লবস্টার যা চান তাই পাবেন।
জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ
- পৌষী রেস্তোরাঁ: স্থানীয়দের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। লইট্টা ফ্রাই, রূপচাঁদা কারি, চিংড়ি ভুনা সবই অসাধারণ। দাম খুব কম, খাবারের মান চমৎকার। দুপুরে ভিড় বেশি থাকে।
- ঝাউবন রেস্তোরাঁ: বাংলাদেশি খাবারে বিশেষজ্ঞ। ফ্রাইড ফিশ এখানকার স্পেশালিটি। সি বিচ রোডে অবস্থিত।
- হান্ডি রেস্তোরাঁ: বিরিয়ানি আর বিফ কারির জন্য বিখ্যাত। বাটার নান দারুণ। সার্ভিস ফাস্ট, পরিবেশ ভালো। সবসময় জমজমাট থাকে।
- মারমেইড ক্যাফে: বিচের পাশে। সিফুড প্ল্যাটার, টম ইয়াম স্যুপ, গ্রিল্ড ফিশ সব কিছু চমৎকার। একটু দামি, তবে পরিবেশ আর খাবারের মান ভালো। লাইভ মিউজিকও হয়।
- সল্ট বিস্ট্রো অ্যান্ড ক্যাফে: ফিউশন ফুড। চিকেন টেরিয়াকি, থাই স্যুপ, স্মুদি মডার্ন ধরনের খাবার। ইনডোর-আউটডোর দুই ধরনের বসার জায়গা।
- আল গনি রেস্তোরাঁ: সিফুড প্ল্যাটার আর বিফ কারি দারুণ। পরিবার নিয়ে খেতে ভালো লাগবে।
- কৈয়া রেস্তোরাঁ: বিবিকিউয়ের জন্য বিখ্যাত। রেড স্ন্যাপার, গার্লিক নান চেখে দেখবেন। সমুদ্রের পাশে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
অবশ্যই যা খাবেন
- চিংড়ি ভুনা: তাজা চিংড়ি মশলা দিয়ে রান্না। ভাতের সাথে দারুণ লাগে।
- কাঁকড়া ঝাল: কাঁকড়া ঝাল মশলা দিয়ে রান্না করা। একদম মজাদার।
- লইট্টা ফ্রাই: ছোট মাছ তেলে ভেজে খাস্তা করা। একবার খেলে বারবার খেতে ইচ্ছে করবে। খুবই সস্তা, ৫০-৭০ টাকায় পাওয়া যায়।
- রূপচাঁদা কারি: রূপচাঁদা মাছ ঝোল কারিতে। ভাতের সাথে পারফেক্ট।
- শুঁটকি ভর্তা: শুকনো মাছ ভর্তা করা। স্থানীয় বিশেষত্ব। মজা একদম অন্য রকম।
- পাহাড়ি মুরগি: পাহাড়ি মুরগির ঝাল ঝোল। দেশি মুরগির চেয়ে স্বাদ আলাদা। কিছুটা দামি হলেও চেষ্টা করে দেখবেন।
- ইলিশ ভাজা: ইলিশ মাছ ভাজা। শর্ষে ইলিশও পাবেন অনেক জায়গায়।
- লবস্টার গ্রিল: তাজা লবস্টার গ্রিল করা। দাম রেস্তোরাঁভেদে ভিন্ন হয়, কিনার আগে দাম জেনে নেবেন।
- ভর্তা প্লেটার: নানা রকমের ভর্তা টমেটো, বেগুন, আলু, মাছ সব একসাথে। ভাতের সাথে দারুণ।
আরও: আকিলপুর সমুদ্র সৈকত
শপিং করবেন কোথায়
- বার্মিজ মার্কেট: সুগন্ধা পয়েন্টে অবস্থিত। মিয়ানমারের জিনিসপত্র পাওয়া যায় এখানে। লংগি, থানাকা (মিয়ানমারের ঐতিহ্যবাহী প্রসাধনী), মুক্তার গহনা, সানগ্লাস, ব্যাগ কত কী। দামদর করে কিনবেন, অনেক সময় বেশি দাম চায়।
- শেল মার্কেট: সৈকতের পাশে শামুক-ঝিনুকের তৈরি জিনিস বিক্রি হয়। শো-পিস, গহনা, ঘরসাজানোর জিনিস পাবেন। তবে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে কিনবেন। অতিরিক্ত শেল সংগ্রহ সমুদ্রের জন্য ক্ষতিকর।
- হোটেল মোটেল জোন: এই এলাকায় অনেক শপিং মল আর দোকান আছে। পোশাক, জুতা, উপহার সামগ্রী, বই সব পাওয়া যায়।
- শুঁটকি বাজার: শুকনো মাছ কিনতে চাইলে মূল বাজারে যেতে হবে। লইট্টা, রূপচাঁদা, চিংড়ি নানা রকমের শুঁটকি পাবেন। ঢাকায় ফেরার সময় নিয়ে যেতে পারেন। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার।
আরও: ইনানী সমুদ্র সৈকত
কক্সবাজার বাজেট প্ল্যানিং
বাজেট ট্রিপ (প্রতিদিন ১,৫০০-২,৫০০ টাকা):
- থাকা: ৮০০-১,২০০ টাকা
- খাওয়া: ৫০০-৮০০ টাকা
- যাতায়াত: ২০০-৫০০ টাকা
মিড-রেঞ্জ ট্রিপ (প্রতিদিন ৩,০০০-৫,০০০ টাকা):
- থাকা: ২,০০০-৩,০০০ টাকা
- খাওয়া: ৮০০-১,৫০০ টাকা
- যাতায়াত: ২০০-৫০০ টাকা
লাক্সারি ট্রিপ (প্রতিদিন ৮,০০০+ টাকা):
- থাকা: ৫,০০০-১৫,০০০ টাকা
- খাওয়া: ২,০০০-৩,০০০ টাকা
- যাতায়াত: ১,০০০+ টাকা
স্থানীয় যাতায়াত
- রিকশা/ইজিবাইক: শহরের মধ্যে ঘোরার জন্য। ভাড়া ২০-৫০ টাকা।
- সিএনজি/অটো: একটু দূরে যেতে হলে। ভাড়া ৫০-২০০ টাকা, দূরত্ব অনুযায়ী।
- জিপ/মাইক্রো ভাড়া: ইনানী, হিমছড়ি, টেকনাফ যেতে। পুরো দিনের জন্য ভাড়া ২,৫০০-৫,০০০ টাকা।
- মোটরসাইকেল ভাড়া: মেরিন ড্রাইভ ঘুরতে। দৈনিক ভাড়া ১,০০০-১,৫০০ টাকা। ড্রাইভিং লাইসেন্স লাগবে।
আরও: সেন্টমার্টিন দ্বীপ
প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও টিপস
- লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলুন
- লাল পতাকা থাকলে সমুদ্রে নামবেন না
- বেশি গভীরে যাবেন না, ঢেউ হঠাৎ বড় হতে পারে
- বাচ্চাদের চোখে চোখে রাখুন
- সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পরুন
- সানস্ক্রিন অবশ্যই ব্যবহার করুন (SPF 30+)
- টুপি বা ক্যাপ পরুন ও সানগ্লাস পরুন
- মূল্যবান জিনিস হোটেলের সেফে রাখুন
- মোবাইল ফোন সাবধানে রাখুন
- অপরিচিত খাবার খেতে সাবধান থাকুন
- প্রয়োজনীয় ওষুধ সাথে নিয়ে যান
- সন্ধ্যার পর একা সৈকতে যাবেন না
- হালকা সুতি কাপড় (গরমের জন্য) ও সোয়েটার/জ্যাকেট (শীতের জন্য) নিন
- হাঁটার জুতা/চপ্পল
- মোবাইল চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক
- ক্যামেরা (ছবি তুলতে)
- ছোট ব্যাগপ্যাক (দিনের ট্যুরের জন্য)
ফটোগ্রাফি টিপস
- সূর্যোদয়ের জন্য রাডার স্টেশন বেস্ট
- সূর্যাস্তের জন্য লাবনী বা কলাতলী বিচ
- ইনানীতে প্রবাল পাথরের ছবি তুলবেন
- মেরিন ড্রাইভে ড্রাইভ করতে করতে ছবি তুলুন
- হিমছড়ি ঝর্ণা বর্ষায় সবচেয়ে সুন্দর
- স্থানীয় মানুষের ছবি তুলতে চাইলে অনুমতি নিন
- সকাল-সন্ধ্যার আলো ছবির জন্য সবচেয়ে ভালো
ইন্টারনেট ও কানেক্টিভিটি
সব মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক ভালো পাওয়া যায় কক্সবাজার শহরে। হোটেল আর রেস্তোরাঁতে ওয়াই-ফাই থাকে। তবে ইনানী বা টেকনাফে নেটওয়ার্ক একটু দুর্বল হতে পারে।
বিশেষ আকর্ষণ
- সার্ফিং: কক্সবাজারে সার্ফিং জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিভিন্ন সার্ফ স্কুল আছে যেখানে লেসন নেওয়া যায়। সার্ফবোর্ড ভাড়া পাওয়া যায় সৈকতে। নতুনদের জন্য ইন্সট্রাক্টর আছে।
- প্যারাসেইলিং: বিভিন্ন সৈকত এলাকায় প্যারাসেইলিং সুবিধা আছে। উপর থেকে সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। নিরাপত্তা সরঞ্জাম পরে করতে হয়।
- জেট স্কিইং: অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য জেট স্কিইং। কলাতলী আর ইনানীতে এই সুবিধা পাওয়া যায়। প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা নিরাপদ।
- সি পার্ল ওয়াটার পার্ক: পরিবার আর বাচ্চাদের জন্য আদর্শ। বিভিন্ন ধরনের ওয়াটার স্লাইড, পুল আছে। প্রবেশ ফি আছে। পুরো দিন মজা করার জায়গা।
- বিচ ভলিবল ও ফুটবল: সৈকতে ভলিবল আর ফুটবল খেলা যায়। স্থানীয়দের সাথে খেলতে পারবেন। বল সাথে না থাকলে ভাড়া পাওয়া যায়।
আরও: সুখিয়া ভ্যালি
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
- মহেশখালী দ্বীপ: কক্সবাজার থেকে বোটে মহেশখালী যাওয়া যায়। পাহাড়ের উপর আদিনাথ মন্দির দেখতে হবে। নারকেল বাগান, লবণ উৎপাদন দেখার মতো। শান্ত পরিবেশে এক দিন কাটানো যায়।
- রামু: বৌদ্ধ মন্দির দেখতে রামু যেতে পারেন। অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর মন্দির আছে। বৌদ্ধ সংস্কৃতি জানার সুযোগ। কক্সবাজার থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে।
- দুলাহাজারা সাফারি পার্ক: বন্যপ্রাণী দেখতে চাইলে সাফারি পার্ক ভালো অপশন। চট্টগ্রামের কাছে অবস্থিত। হাতি, বাঘ, সিংহ নানা রকম প্রাণী দেখা যায়। কক্সবাজার যাওয়ার পথে ঘুরে আসতে পারেন।
- হিমছড়ি
- ইনানী সমুদ্র সৈকত
- রেডিয়েন্ট ফিস ওয়ার্ল্ড
- সেন্টমার্টিন
জরুরি যোগাযোগ
- জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯
- ট্যুরিস্ট পুলিশ: ০১৩২০০০০৮৮৮
- ফায়ার সার্ভিস: ১৬১৬৩
- অ্যাম্বুলেন্স: ১৯৯
- কক্সবাজার সদর হাসপাতাল: ০৩৪১-৬৩৭৮৯
- কক্সবাজার পুলিশ স্টেশন: ০৩৪১-৬৩০০১
আরও: কম খরচে বেশি জায়গা ঘোরার স্মার্ট উপায়
কক্সবাজার নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
কক্সবাজার ভ্রমণের জন্য কতদিন সময় দরকার?
কক্সবাজারে ঘোরাঘুরির জন্য আদর্শ সময় ৩-৪ দিন। শুধু মূল সৈকত এলাকা দেখতে চাইলে ২ দিন যথেষ্ট, কিন্তু ইনানী বিচ, হিমছড়ি, মেরিন ড্রাইভ কভার করতে চাইলে ৪-৫ দিন লাগবে। সেন্ট মার্টিন যেতে চাইলে আলাদা ১-২ দিন বাড়তি রাখুন। প্রথমবার গেলে ৩ দিন ২ রাত পারফেক্ট প্রথম দিন বিচ আর সূর্যাস্ত, দ্বিতীয় দিন ইনানী-হিমছড়ি, তৃতীয় দিন মেরিন ড্রাইভ ঘুরে ফেরা।
কক্সবাজারে কি সারা বছর সমুদ্রে নামা যায়?
না, সারা বছর নিরাপদে সমুদ্রে নামা যায় না। শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) আর বসন্তের শুরুতে (মার্চ-এপ্রিল) সমুদ্র শান্ত থাকে, তখন নামা নিরাপদ। বর্ষাকালে (মে-অক্টোবর) সমুদ্র উত্তাল হয়, বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে এই সময় ঝুঁকিপূর্ণ। লাল পতাকা দেখলে একদম নামবেন না। বর্ষায় গেলে হাঁটু বা কোমর পর্যন্ত থাকুন, বেশি গভীরে নয়। লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলুন।
কক্সবাজারে কি নিরামিষ খাবার পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, প্রায় সব রেস্তোরাঁতেই নিরামিষ খাবার পাওয়া যায়। ডাল, সবজি তরকারি, ভর্তা (বেগুন, আলু, টমেটো), মিক্সড ভেজিটেবল, ভাত, রুটি পাবেন। হান্ডি, পৌষী, সল্ট বিস্ট্রোতে ভালো নিরামিষ খাবার আছে। চাইনিজ রেস্তোরাঁয় ভেজিটেবল চাউমিন, ফ্রাইড রাইস পাবেন। অর্ডার দেওয়ার সময় স্পষ্ট করে বলুন যে নিরামিষ চান।
কক্সবাজার কি পরিবার আর বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ?
হ্যাঁ, কক্সবাজার পরিবার আর বাচ্চাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। ট্যুরিস্ট পুলিশ সক্রিয়, বিশেষত প্রধান সৈকতে। বাচ্চাদের জন্য আছে বিচে খেলা, ওয়াটার পার্ক, ঘোড়ার গাড়ি, বিচ বাইক। বেশিরভাগ হোটেলে বাচ্চাদের পুল, খেলার জায়গা আছে। তবে সমুদ্রে নামানোর সময় পাশে থাকুন, রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য সানস্ক্রিন দিন, খাবারে সতর্ক থাকুন।
কক্সবাজারে কি এটিএম সুবিধা আছে?
কক্সবাজারে পর্যাপ্ত এটিএম সুবিধা আছে। ডাচ-বাংলা, ব্র্যাক, এক্সিম, সিটি, ইসলামী ব্যাংকের এটিএম হোটেল মোটেল জোন, শপিং এলাকা আর প্রধান সড়কে আছে। বড় হোটেলের লবিতেও পাবেন।
কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কীভাবে যাবো এবং কতক্ষণ লাগবে?
সেন্ট মার্টিন যেতে আগে টেকনাফ যেতে হবে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ ৮০-৯০ কিলোমিটার দূরে। বাসে ৩-৪ ঘণ্টা (ভাড়া ৬০-১০০ টাকা) বা জিপে ২-৩ ঘণ্টা (৩,০০০-৫,০০০ টাকা)। টেকনাফ বন্দর থেকে জাহাজে ২-৩ ঘণ্টা লাগে।
কক্সবাজারে মোবাইল নেটওয়ার্ক কেমন?
মূল শহর আর সৈকত এলাকায় (লাবনী, কলাতলী, সুগন্ধা) সব অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্ক চমৎকার। বেশিরভাগ হোটেল-রেস্তোরাঁয় ফ্রি ওয়াই-ফাই আছে। তবে ইনানী, হিমছড়ি, টেকনাফের দিকে নেটওয়ার্ক দুর্বল হতে পারে।
কক্সবাজারে কি রাতে করার মতো কিছু আছে?
হ্যাঁ, রাতেও বেশ কিছু করার আছে। লাবনী-কলাতলী বিচ রাতে রঙিন আলোয় সাজানো থাকে, হাঁটা যায়। অনেক রেস্তোরাঁয় লাইভ মিউজিক হয় (মারমেইড ক্যাফে, সল্ট বিস্ট্রো)। বিচসাইড ক্যান্ডেল লাইট ডিনার পাওয়া যায়। বড় হোটেলে বার/লাউঞ্জ, রুফটপ ক্যাফে আছে। বার্মিজ মার্কেট রাত ৯-১০টা পর্যন্ত খোলা। পূর্ণিমায় বিচে চাঁদ দেখা অসাধারণ। তবে রাত ১১-১২টার পর নিরাপত্তার জন্য হোটেলে ফিরুন।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য কত এবং কেন এটি বিশেষ?
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল), যা বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। এটি ব্রাজিলের প্রাইয়া দো ক্যাসিনো, অস্ট্রেলিয়ার নাইনটি মাইল বিচের পর পঞ্চম দীর্ঘতম। জোয়ারের সময় সৈকত ২০০ মিটার আর ভাটার সময় ৪০০ মিটার চওড়া হয়। এর বিশেষত্ব হলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, অবিচ্ছিন্ন, মসৃণ বালি, আর কোনো বাধা ছাড়াই দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত।
কক্সবাজারে কি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়?
হ্যাঁ, কক্সবাজারে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়, তবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে। সূর্যোদয় দেখার জন্য লাবনী বিচ বা রাডার স্টেশন সেরা সকাল ৫:৩০-৬:৩০টায় সমুদ্র থেকে সূর্য উঠে আসে, দৃশ্যটা অসাধারণ। সূর্যাস্ত দেখার জন্য কলাতলী বা ইনানী বিচ ভালো, সন্ধ্যা ৫:৩০-৬:৩০টায় সমুদ্রে সূর্য ডুবে যায়। লাল-কমলা রঙের আকাশ আর সমুদ্রের মিশ্রণ ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গ। শীতকালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।
কক্সবাজারে গেলে কি পাসপোর্ট/ভিসা লাগে (বিদেশি পর্যটকদের জন্য)?
বাংলাদেশি নাগরিকদের কক্সবাজার যেতে কোনো পাসপোর্ট বা পারমিট লাগে না। বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশ ভিসা লাগবে, যা ঢাকার দূতাবাস থেকে বা অনলাইনে নিতে হয়। কক্সবাজার পৌঁছানোর পর কোনো অতিরিক্ত পারমিট দরকার নেই। তবে সেন্ট মার্টিন যেতে চাইলে পাসপোর্টের কপি সাথে রাখা ভালো (যদিও বাধ্যতামূলক নয়)।
কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার বর্ডার কত দূরে এবং যাওয়া যায় কি?
কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার বর্ডার (নাফ নদী) প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার দূরে টেকনাফে। টেকনাফ গেলে নাফ নদীর ওপার থেকে মিয়ানমার দেখা যায়। তবে বর্ডার ক্রসিং সাধারণ পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ এবং বিপজ্জনক মিয়ানমার পক্ষ থেকে মাইন পোঁতা আছে। টেকনাফ যেতে পারবেন, নদীর তীর থেকে মিয়ানমার দেখতে পারবেন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই পার হওয়ার চেষ্টা করবেন না। রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
কক্সবাজারে কি ডলফিন বা সামুদ্রিক প্রাণী দেখা যায়?
কক্সবাজার সৈকতে সরাসরি ডলফিন দেখা বিরল, তবে মাঝে মাঝে দূরে ডলফিন লাফ দিতে দেখা যায়, বিশেষত সকালে বা সন্ধ্যায়।
কক্সবাজারে কি হালাল খাবার পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, কক্সবাজারে প্রায় সব খাবারই হালাল। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় সব রেস্তোরাঁ, হোটেল, স্ট্রিট ফুড সবকিছুই হালাল মান অনুসরণ করে। শুয়োরের মাংস পাওয়া যায় না। অ্যালকোহলও সাধারণত পাওয়া যায় না (কিছু বড় আন্তর্জাতিক হোটেলে থাকতে পারে বিদেশিদের জন্য)।
কক্সবাজারে কি ক্যাম্পিং করা যায়?
কক্সবাজারে সরাসরি বিচে ক্যাম্পিং সরকারিভাবে অনুমোদিত নয় এবং নিরাপত্তার কারণে নিষেধ। তবে কিছু রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে ক্যাম্পিং প্যাকেজ অফার করে।
কক্সবাজারে কি বর্ষায় যাওয়া উচিত?
বর্ষায় (জুন-সেপ্টেম্বর) কক্সবাজার যাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়, তবে একদম বন্ধ নয়। যারা ভিড় এড়াতে চান, বাজেট ট্রিপ করতে চান, প্রকৃতির ভিন্ন রূপ দেখতে চান তারা বর্ষায় যেতে পারেন। সুবিধা: হোটেল-রিসোর্টের দাম ৫০% কম, পর্যটক কম, প্রকৃতি সবুজে ভরপুর, হিমছড়ি ঝর্ণা পূর্ণ যৌবনে। অসুবিধা: সমুদ্রে নামা বিপজ্জনক, ঘন ঘন বৃষ্টি, উত্তাল ঢেউ, কিছু জায়গা যাওয়া কঠিন। বর্ষায় গেলে রেইনকোট, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ নিন, সমুদ্রে না নেমে বিচে হাঁটুন, হোটেলে বেশি সময় কাটান।
কক্সবাজারে কি হানিমুন কাপলদের জন্য বিশেষ সুবিধা আছে?
হ্যাঁ, কক্সবাজার হানিমুনের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্য। অনেক রিসোর্ট বিশেষ হানিমুন প্যাকেজ দেয় সমুদ্রমুখী রুম, ক্যান্ডেললাইট ডিনার, ফ্লাওয়ার ডেকোরেশন, স্পেশাল কেক, কাপল স্পা। সায়েমান, সি পার্ল, মারমেইড রিসোর্টে লাক্সারি ভিলা আছে। প্রাইভেট বিচ এরিয়া, রুম সার্ভিস ডিনার, সানসেট ক্রুজ (কিছু জায়গায়) পাওয়া যায়। ইনানী বিচ কম ভিড়ের কারণে কাপলদের পছন্দ। মেরিন ড্রাইভে বাইক রাইড, হিমছড়িতে প্রাইভেট পিকনিক রোমান্টিক অভিজ্ঞতা। আগে থেকে প্যাকেজ বুক করে নিন, অফ-সিজনে গেলে আরও ভালো প্রাইভেসি পাবেন।
পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকুন প্লাস্টিক ব্যবহার কমান, সমুদ্রে বা বিচে ময়লা ফেলবেন না, প্রবাল পাথর তুলে নিয়ে আসবেন না, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন। আগামী প্রজন্মও যেন এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। আপনার ভ্রমণ হউক সহজ, নিরাপদ এবং আনন্দময়।
ফেসবুক: GoArif
