কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ

একটি মাসের নাম কীভাবে হয়ে উঠল বৈষম্যের প্রতীক, বাংলার কৃষিজীবী সমাজের সেই হাসি ও কান্নার গল্প।

বাংলা প্রবাদের ভাণ্ডারে এমন কিছু কথা আছে যেগুলো শুনলেই বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে অনুভূতি হয়। “কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ” -এই প্রবাদটা ঠিক তেমনি। মাত্র ৫টি শব্দে এই বাক্য বলে দেয় মানব সমাজের সবচেয়ে পুরনো ও কঠিন সত্য, একই পৃথিবীতে, একই সময়ে, দুই মানুষের অভিজ্ঞতা দুই মেরুর মতো আলাদা।

পৌষ মাস বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাস। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পড়া এই মাস শীতের সবচেয়ে তীব্র সময়। একদিকে সম্পন্ন ঘরে নতুন ধানের পিঠাপুলি আর খেজুরের রসের উৎসব, অন্যদিকে দিনমজুরের ঘরে কাজ নেই, খাবার নেই, শীতের কাপড় নেই, এই দুই বাস্তবতাকে এক বাক্যে ধরে ফেলেছে এই অসাধারণ প্রবাদ।

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ
নতুন ধান, পিঠাপুলি, খেজুর রস – আনন্দের মাস। আবার হাড়কাঁপানো শীত, খালি পেট, বেঁচে থাকার লড়াই – সর্বনাশ।

আরও: ধরি মাছ না ছুঁই পানি

পৌষ মাস কেন প্রবাদে এলো

বাংলার কৃষিজীবী সমাজে পৌষ মাস ঐতিহাসিকভাবে আনন্দের মাস, কিন্তু সবার জন্য নয়। অগ্রহায়ণে আমন ধান কাটার পর পৌষ মাসে নতুন চাল ঘরে থাকে। এই চাল দিয়ে তৈরি হয় ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, পায়েস, পৌষ সংক্রান্তিতে বাড়ি বাড়ি উৎসব। খেজুর গাছের হাঁড়িতে জমে মিষ্টি রস, সেই রস থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু গুড়।

কিন্তু এই আনন্দ কেবল তাদের যাদের ঘরে ধান আছে, যারা জমির মালিক, যারা গৃহস্থ। যে কৃষক জমি থেকে ফসল তোলে, পৌষ মাস তার কাছে সত্যিই উৎসবের মাস। কিন্তু যে দিনমজুর অন্যের মাঠে কাজ করে, ধান কাটার মৌসুম শেষ হয়ে গেলে তার কাজ নেই। শীতের তীব্রতায় খালি গা, খালি পেট, তার কাছে পৌষ মাস মানেই সর্বনাশ।

পৌষ মাসে গৃহস্থের ঘরে ঘরে নতুন চালে পিঠাপুলি পায়েস ইত্যাদির আয়োজন হয়। খেজুর গাছে বাঁধা হাঁড়ি মিষ্টি রসে পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু “কারও সর্বনাশ” কথাটার মাধ্যমে শীতে কষ্ট পাওয়া হতদরিদ্র মানুষের কথাই বলা হয়।

পৌষ মাস

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে পৌষ মাস পুষ্যা নক্ষত্রের নামে। এই মাসে মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি পালিত হয়, ঘুড়ি ওড়ানো, পিঠা উৎসব, পৌষমেলা। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা এখনো বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম বড় আয়োজন। কিন্তু এই উৎসবের আলোর নিচেই লুকিয়ে আছে আরেকটা বাস্তবতা, যাদের গায়ে গরম কাপড় নেই, তাদের কাছে শীতের এই মাস মানেই বেঁচে থাকার লড়াই।

আরও: অতি লোভে তাঁতি নষ্ট

প্রবাদটির ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

প্রবাদটির গঠন অত্যন্ত সরল, কিন্তু শক্তি অসাধারণ। “কারো… কারো…” -এই সমান্তরাল কাঠামো দুটো বিপরীত সত্যকে একসাথে উপস্থাপন করে। বাংলা ভাষায় এই ধাঁচের প্রবাদ বিরল, যেখানে কোনো নৈতিক শিক্ষা নেই, কোনো উপদেশ নেই; শুধু একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতার নিরপেক্ষ উপস্থাপন। এটাই এই প্রবাদকে অনন্য করে তুলেছে।

অংশআক্ষরিক অর্থপ্রতীকী অর্থ
কারো (প্রথম)কোনো একজনেরসুবিধাভোগী শ্রেণি
পৌষ মাসবাংলার নবম মাসফসল, উৎসব, সম্পদ ও সুখের প্রতীক
কারো (দ্বিতীয়)অন্য কোনো একজনেরবঞ্চিত শ্রেণি
সর্বনাশসব নষ্ট হয়ে যাওয়াদারিদ্র্য, বেঁচে থাকার সংকট

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এই প্রবাদের জীবন্ত চিত্র

এই প্রবাদ বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় এখনো প্রতিদিন সত্যি। ধানের মৌসুমে বড় কৃষকের গোলা ভরে ওঠে, কিন্তু যে ভূমিহীন চাষি অন্যের জমিতে কাজ করে সে শীতে কাজ হারায়। শিক্ষিত চাকরিজীবীর বোনাস আসে ঈদে, আর কারখানার শ্রমিকের মজুরি বকেয়া থাকে। কারো বিয়ে হয় বিশাল অনুষ্ঠানে, কারো ঘরে সেই একই সময়ে চুলা জ্বলে না।

প্রথম আলোর কলামিস্টরাও এই প্রবাদ ব্যবহার করেছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে। জিডিপি বাড়লেও মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছায় না, একজনকে কোটিপতি বানাতে গেলে অনেককে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে হয়। এই অসামঞ্জস্যই হলো “কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ”-এর আধুনিক রূপ।

আরও: গোল্লাছুট

বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় সমমর্মী প্রবাদ

ভাষা / ঐতিহ্যপ্রবাদমূল বার্তা
বাংলা (সমার্থক)কারো ঘর পোড়ে, কেউ আলো পোহায়একের ক্ষতি অন্যের লাভ
ইংরেজিOne man’s loss is another man’s gainসুযোগের বিষম বণ্টন
ইংরেজি (রোমান ঐতিহ্য)Nero fiddles while Rome burnsকেউ উৎসব করে, কেউ বিপদে পোড়ে
হিন্দিकिसी के लिए पर्व, किसी के लिए शोकকারো উৎসব, কারো শোক
ফরাসিLe bonheur des uns fait le malheur des autresএকের সুখ অন্যের দুঃখ

প্রবাদের সমাজদর্শন ও আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা

এই প্রবাদ অন্য প্রবাদগুলো থেকে আলাদা কারণ এখানে কোনো নৈতিক উপদেশ নেই। “অতি লোভে তাঁতি নষ্ট” সতর্ক করে, “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” কৌশল বোঝায়, কিন্তু “কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ” কাউকে দোষ দেয় না, কাউকে সতর্কও করে না। এটি শুধু বলে: পৃথিবীতে বৈষম্য আছে, সবার ভাগ্য সমান নয়।

এই নিরপেক্ষতাই এই প্রবাদের শক্তি। আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে “inequality” বা “unequal distribution of wealth”, বাংলার মানুষ শতাব্দী আগে সেটাকে ছয় শব্দে বলে দিয়েছে। শেয়ারবাজারে কেউ লাভ করে, কেউ সর্বস্ব হারায়। যুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসায়ীর মুনাফা বাড়ে, মানুষ মরে। এক জায়গায় খরা, আরেক জায়গায় বন্যা, প্রকৃতিও মানে এই প্রবাদ।

এই প্রবাদে শেকড় খুঁজে পায় বাংলার সমাজচেতনার শিকড়। যে সমাজে শত শত বছর আগেই মানুষ বুঝত, সুখ ও দুঃখ কখনো সমান বণ্টিত হয় না, সেই সমাজের ভাষায় জন্ম নেওয়া প্রতিটি প্রবাদ আমাদের পরিচয়ের টুকরো

আরও: বায়োস্কোপ

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

“কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ” – প্রবাদটির মূল অর্থ কী?

প্রবাদটির মূল অর্থ হলো, একই সময়ে এক জনের বিরাট আনন্দ বা লাভ হয়, অন্যজনের বিরাট ক্ষতি বা দুঃখ হয়। সংক্ষেপে: কারো সৌভাগ্য, কারো দুর্ভাগ্য। এটি সমাজের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।

প্রবাদে পৌষ মাসকে কেন আনন্দের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে?

পৌষ মাসে নতুন ধান কাটার পর গৃহস্থ ঘরে পিঠাপুলি, পায়েস ও উৎসবের আয়োজন হয়। খেজুর রস ও গুড়ের মৌসুম এটি। পৌষ সংক্রান্তি, পৌষমেলা – এসব উৎসবের কারণে সম্পন্ন ঘরে এই মাস আনন্দের। তাই প্রবাদে পৌষ মাস = সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

তাহলে “সর্বনাশ” অংশটা কাদের জন্য?

দিনমজুর, ভূমিহীন কৃষক ও দরিদ্র মানুষদের জন্য। ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে তাদের কাজ থাকে না, আয় বন্ধ হয়ে যায়। তার উপর কনকনে শীতে গরম কাপড় নেই, ফলে পৌষ মাস তাদের কাছে সত্যিকারের সর্বনাশের মাস।

এই প্রবাদটি অন্য প্রবাদের চেয়ে আলাদা কীভাবে?

বেশিরভাগ প্রবাদ নৈতিক উপদেশ দেয় বা সতর্ক করে। কিন্তু “কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ” কাউকে দোষ দেয় না, কাউকে পরামর্শও দেয় না। এটি শুধু একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতার নিরপেক্ষ বর্ণনা, সমাজে বৈষম্য আছে, এই সত্যটা বলে দেয়। এই নিরপেক্ষতাই এটিকে বিশেষ করে তোলে।

আধুনিক সময়ে এই প্রবাদের প্রয়োগ কোথায় দেখা যায়?

বহু জায়গায়। শেয়ারবাজারে কারো লাভ মানেই অন্যের ক্ষতি। মহামারিতে কিছু ব্যবসায়ীর আয় বাড়লে লাখো মানুষ কাজ হারায়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে কেউ উঠে আসে, কেউ পড়ে যায়। মূল্যস্ফীতিতে ধনীরা খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, কিন্তু গরিবের জীবন দুর্বিষহ হয়।

শেয়ার করুন
গোআরিফ লগো আইকনগোআরিফ লগো আইকন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিন

আপনার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।