গোল্লাছুট (Gollachhut) ছিল সেই খেলা যেটায় কোনো টাকা লাগত না, কোনো সরঞ্জাম লাগত না, খেলার মাঠ থাকলেই হয়। আর এই “শুধু মাঠ লাগে” -এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। শহরে মাঠ নেই, গ্রামে মাঠ কমে যাচ্ছে, আর হাতে হাতে চলে এসেছে স্মার্টফোন।
স্কুল থেকে ফিরেই ব্যাগ ছুড়ে দিয়ে মাঠে দৌড়। “আয় গোল্লাছুট খেলি!” -এই একটা ডাকেই মাঠে জমে যেত দল। লাগত না কিছুই। শুধু মাটিতে একটা লাঠি পুঁতে বৃত্ত আঁকো, আর শুরু হয়ে যাক খেলা। রোদ থাকুক, বৃষ্টি পড়ুক বিকেলটা গোল্লাছুটের।
আরও: কাবাডি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| খেলার নাম | গোল্লাছুট |
| আঞ্চলিক নাম | ঘুরচণ্ডি, গোল্লাখেলা |
| দলের আকার | ৫ বা ৭ জন করে দুই দল |
| দলনেতার নাম | গোদা |
| আক্রমণ দলের নাম | গোল্লাদল |
| রক্ষণ দলের নাম | ছুটদল |
| মাঠের প্রয়োজন | খোলা জায়গা বা স্কুল মাঠ |
| উপকরণ | একটি লাঠি, মাটিতে দাগ |
| বর্তমান অবস্থা | প্রায় বিলুপ্ত |
নামের অর্থ ও উৎপত্তি
গোল্লাছুট নামটি দুটো শব্দ মিলিয়ে তৈরি। “গোল্লা” মানে বৃত্ত বা গোলদাগ, মাটিতে লাঠি পুঁতে যে গোল দাগ কাটা হয় সেটাই গোল্লা। আর আঞ্চলিক ভাষায় “ছুট” মানে দৌড়ানো। সুতরাং গোল্লাছুট মানে, বৃত্ত থেকে দৌড়ানো। খেলার পুরো কৌশলটাই এই নামে ধরা আছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই খেলা বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোনো কোনো জায়গায় বলে “ঘুরচণ্ডি” কারণ গোলাকার বৃত্তে ঘুরে ঘুরে খেলা হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে “গোল্লাখেলা” বলেও ডাকা হয়। খেলার মূল কাঠামো সর্বত্র একই, তবে নিয়মে কিছুটা আঞ্চলিক ভিন্নতা থাকে।
একটি মজার ব্যাপার, বাংলায় প্রচলিত “পালের গোদা” (দলনেতা) বাক্যটির “গোদা” শব্দটি এই গোল্লাছুট খেলা থেকেই এসেছে বলে অনেকে মনে করেন। গোল্লাছুটে দলনেতাকে “গোদা” বলা হয়।
আরও: লাটিম
মাঠের নকশা

খেলার ধাপে ধাপে নিয়ম
- মাঠ প্রস্তুত: মাটিতে লাঠি পুঁতে কেন্দ্র ঠিক, ২৫-৩০ ফুট দূরে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত
- দল গঠন: দুজন গোদা মিলে জুটিতে নাম রেখে পছন্দ করে দল বানায়
- টস: টসে নির্ধারিত হয় কে আগে গোল্লাদল আর কে ছুটদল
- শিকল গঠন: গোদা লাঠি ছুঁয়ে দাঁড়ায়, বাকিরা হাত ধরে দীর্ঘ শিকল বানায়
- ছুট: শিকলের শেষজন হাত ছেড়ে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে যায়
- বাধা: ছুটদল ছোঁয়া দিলে সেই খেলোয়াড় ওই দানে বাদ
- লাল: গোল্লাদলের কেউ লক্ষ্যবস্তু ছুঁয়ে ফিরলে এক পয়েন্ট (লাল)
- দল বদল: সব দানের পর দল বদলায়, সবচেয়ে বেশি লাল পাওয়া দল জেতে
গোল্লাছুট বনাম হাডুডু
| বিষয় | গোল্লাছুট | হাডুডু / কাবাডি |
|---|---|---|
| কেন্দ্রীয় কৌশল | হাত ধরে শিকল বানিয়ে দৌড় | এক নিঃশ্বাসে রেইড করে ফেরা |
| দম ধরা | লাগে না | অপরিহার্য |
| শারীরিক সংঘাত | শুধু ছোঁয়া, ধরাধরি নেই | ট্যাকল করে ধরে রাখা হয় |
| দলের বন্ধন | হাত ধরে শিকল — আক্ষরিক অর্থেই একতা | সমন্বয় আছে কিন্তু শারীরিক যোগ নেই |
| জাতীয় স্বীকৃতি | নেই | জাতীয় খেলা (১৯৭২) |
| মেয়েদের অংশগ্রহণ | ছেলে-মেয়ে উভয়েই সমানভাবে | মূলত ছেলেদের, মেয়েদের বিভাগ আলাদা |
বর্তমান অবস্থা
গোল্লাছুট হারানোর কারণ একটা নয়, অনেকগুলো মিলিয়ে। প্রথমত, শহরে খোলা মাঠ নেই। যেটুকু ছিল তাতে বহুতল উঠে গেছে। গ্রামেও চাষের জমি বাড়ি হয়ে যাচ্ছে। খেলার জায়গাই নেই তো খেলবে কীভাবে?
দ্বিতীয়ত, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা। আগে বিকেলে মাঠে না গেলে কিছু করার ছিল না। এখন ঘরে বসে ইউটিউব, গেম, ফেসবুক। মাঠে যাওয়ার প্রলোভনটাই কমে গেছে।
তৃতীয়ত, পরিবারের পরিবর্তন। একক পরিবারে বড় হওয়া শিশু পাড়ার খেলার সাথীদের কম চেনে। দল তৈরির সামাজিক নেটওয়ার্কটাই দুর্বল হয়ে গেছে।
আজকের বাংলাদেশে গোল্লাছুট প্রায় বিলুপ্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে, হয়তো কিছু বছরের মধ্যে এই খেলা সত্যিকারের জাদুঘরে রাখার মতো হয়ে যাবে। এখনো কিছু গ্রামের মাঠে বিকেলে দু-একদল শিশুকে গোল্লাছুট খেলতে দেখা যায়, কিন্তু এটা ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
স্কুলের শারীরিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে গোল্লাছুটের উল্লেখ আছে, কিন্তু ব্যবহারিক অনুশীলন নেই। শহরের বেশিরভাগ শিশু এই খেলার নাম জানে, কিন্তু কীভাবে খেলতে হয় সেটা জানে না।
আরও: গরুর গাড়ি
গোল্লাছুট নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
u0022গোদাu0022 কে এবং তার ভূমিকা কী?
গোদা হলো গোল্লাছুটে দলনেতা। গোল্লাদলের গোদা মাটিতে পোঁতা লাঠি (কেন্দ্র) ধরে দাঁড়ান, আর তার হাত ধরে বাকি দলের সবাই একে একে শিকল বানায়। পুরো খেলায় গোদাই হলেন নোঙর, তিনি লাঠি ছেড়ে দিতে পারবেন না। তাঁর কাজ শিকলকে সঠিক দিকে পরিচালিত করা যাতে দলের বাকি সদস্যরা লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছাতে পারে।
খেলায় u0022লালu0022 কী?
গোল্লাছুটে পয়েন্টের পরিভাষা হলো u0022লালu0022। গোল্লাদলের কোনো খেলোয়াড় ছুটদলের ছোঁয়া এড়িয়ে লক্ষ্যবস্তু ছুঁয়ে সফলভাবে ফিরে আসলে এক u0022লালu0022 পায় তার দল। যে দল বেশি লাল পায়, সে দলই জয়ী। কোনো কোনো অঞ্চলে সাতটি u0022গোট্টাu0022 (ছোট পয়েন্ট) মিলে এক লাল হয়।
গোল্লাছুট খেলার সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কোনটি?
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্ত হলো যখন শিকলের শেষজন হাত ছেড়ে দৌড় দেয়। সে মুহূর্তে ছুটদলের সদস্যরা তাকে ছুঁয়ে আউট করার চেষ্টা করে। এই মুহূর্তে গোদাকেও লাঠি ধরে কৌশলে শিকল সামলাতে হয়। আর দৌড়ানো খেলোয়াড়ের দরকার হয় ক্ষিপ্রতা, বুদ্ধি আর সাহস।
মেয়েরাও কি গোল্লাছুট খেলত?
হ্যাঁ, গোল্লাছুটে ছেলে-মেয়ে উভয়েই সমানভাবে অংশগ্রহণ করত। এই খেলায় হাডুডুর মতো শারীরিক সংঘাত নেই, শুধু দৌড়ানো আর ছোঁয়া। তাই মেয়েদের জন্য খেলাটা অনেক বেশি অ্যাক্সেসিবল ছিল। বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর অঞ্চলে মেয়েদের গোল্লাছুট খেলার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ আছে।