কাবাডি বা হাডুডু (Kabaddi) শুধু একটি খেলা নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। কিন্তু এই পরিচয়টাই এখন বিড়ম্বনার কারণ। যে খেলা এককালে গ্রামের প্রতিটি মাঠে জমত, সেটা এখন কাগজে-কলমে জাতীয় খেলা হয়ে আছে, বাস্তবের মাঠে প্রায় অনুপস্থিত।
গ্রামের মাঠে বিকেল হলেই শুরু হত আসর। “হাডু-ডু-ডু-ডু-ডু!” -এই দীর্ঘ ডাক শুনলে আশেপাশের বাড়ি থেকে ছেলেমেয়েরা দৌড়ে আসত। দুই দলে ভাগ হওয়া, মাঝখানে দাগ কাটা, তারপর এক দম নিয়ে বিপক্ষের কোর্টে হানা, এই তীব্র উত্তেজনার খেলাটাই হাডুডু।
আরও: লাটিম
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| দেশীয় নাম | হাডুডু, হা-ডু-ডু |
| আন্তর্জাতিক নাম | কাবাডি |
| আঞ্চলিক নাম | ডু-ডু, কপাটি, ছি-খেলা |
| উৎপত্তিস্থল | ফরিদপুর / বরিশাল (মতভেদ) |
| দলের আকার | ৭ জন করে দুই দল |
| মাঠের মাপ | ১২.৫ × ১০ মিটার (পুরুষ) |
| জাতীয় খেলার স্বীকৃতি | ১৯৭২ সাল |
| ফেডারেশন গঠন | ১৯৭৩ সাল |
| প্রথম আন্তর্জাতিক | ১৯৭৪ সাল (ভারত বনাম বাংলাদেশ) |
নাম ও উৎপত্তি
“হাডুডু” নামটির উৎপত্তি স্বয়ং খেলার পদ্ধতি থেকে। আক্রমণকারী খেলোয়াড় যখন বিপক্ষের কোর্টে প্রবেশ করেন, তখন এক নিঃশ্বাসে বারবার “হা-ডু-ডু-ডু-ডু” বলতে থাকেন, যাতে প্রমাণ হয় তিনি নিঃশ্বাস নেননি এবং টানা ডাক দিতে পারছেন। এই ডাকটাই হয়ে গেছে খেলার নাম।
বিভিন্ন অঞ্চলে এই খেলা বিভিন্ন নামে পরিচিত, ডু-ডু, কপাটি, কাপাটি, কবাটি, ছি-খেলা। উৎপত্তিস্থল নিয়ে মতভেদ আছে, কেউ বলেন ফরিদপুর, কেউ বলেন বরিশাল। তবে এটা যে বাংলাদেশের নিজস্ব খেলা তাতে সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিক পরিসরে “কাবাডি” নামটি প্রচলিত, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এই নামেই পরিচিত।
কাবাডির উৎপত্তি সম্পর্কে একটি লোককথা আছে, মহাভারতে অভিমন্যু কর্তৃক কৌরব সৈন্যদের চক্রব্যূহ ভেদ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টার ঘটনা থেকে ধারণা নিয়ে নাকি এ খেলার সৃষ্টি। একা ঢোকা, ঘিরে ফেলার বিরুদ্ধে লড়াই করে বেরিয়ে আসার চেষ্টা, দুটোতেই এই মিল আছে।
আরও: ঢেঁকি
মাঠের নকশা ও খেলার কাঠামো
কাবাডি কোর্টের মানচিত্র (পুরুষ – ১২.৫ × ১০ মিটার)

খেলার মূল নিয়ম
হাডুডু / কাবাডির মূল কৌশল হলো, এক জন আক্রমণকারী (রেইডার) এক নিঃশ্বাসে বিপক্ষের কোর্টে ঢুকে যতজনকে পারে ছুঁয়ে নিজ কোর্টে ফিরে আসবে। বিপক্ষ তাকে আটকানোর চেষ্টা করবে। যদি রেইডার ফিরে আসতে পারে, যাদের ছুঁয়েছে তারা আউট। যদি তার দম ফুরিয়ে যায় বা বিপক্ষ আটকে ফেলে, সে আউট।
- রেইড: আক্রমণকারী এক নিঃশ্বাসে বিপক্ষের কোর্টে প্রবেশ করেন
- দম: “হা-ডু-ডু” বলতে থাকা মানে নিঃশ্বাস নেওয়া হয়নি
- ট্যাকল: রক্ষণ দল আক্রমণকারীকে ধরে কোর্টে আটকে রাখে
- পয়েন্ট: প্রতি আউট খেলোয়াড়ের জন্য ১ পয়েন্ট
- লোনা: পুরো দল আউট হলে বিপক্ষ ২ বোনাস পয়েন্ট পায়
- পুনরুজ্জীবন: পয়েন্ট পেলে আউট খেলোয়াড় মাঠে ফেরে
- সময়: দুই ২০ মিনিট হাফ, মাঝে ৫ মিনিট বিরতি
- দল: ৭ জন মাঠে, মোট ১২ জন স্কোয়াড
হাডুডু বনাম কাবাডি
| বিষয় | হাডুডু (ঐতিহ্যবাহী) | কাবাডি (আধুনিক) |
|---|---|---|
| নিয়মকানুন | কোনো নির্দিষ্ট বিধি নেই, এলাকাভেদে ভিন্ন | আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের নিয়ম মানা হয় |
| মাঠ | যেকোনো খোলা জায়গায়, দাগ টেনে | নির্দিষ্ট মাপের কোর্ট – ১২.৫ × ১০ মিটার |
| রেফারি | নেই – দু’দল মিলে সিদ্ধান্ত | একজন রেফারি, দুজন আম্পায়ার |
| পোশাক | যা পরা আছে | নির্দিষ্ট জার্সি, শর্টস |
| পরিবেশ | গ্রামের মাঠ, মেলা, উঠান | স্টেডিয়াম বা ইনডোর কোর্ট |
| দর্শক | সারা গ্রাম | প্রতিযোগিতা-নির্ভর |
গ্রামীণ জীবনে হাডুডুর ভূমিকা
হাডুডু ছিল একটা সম্প্রদায়ের খেলা। শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই খেলার চারপাশে তৈরি হত উৎসবের পরিবেশ। দর্শকরা দুই পক্ষ নিত, চিৎকার করত, উল্লাস করত। গ্রামের প্রবীণরা কোচ হিসেবে পরামর্শ দিতেন। খেলা শেষে দু’দলের একসাথে বসে খাওয়া ছিল নিয়ম।
“যখন ছোট ছিলাম, মানুষ এ খেলা দেখার জন্য পাগল ছিল। এ খেলাটি এক সময় মানুষের প্রাণের খেলা ছিল।” – আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক
উৎসব ও পার্বণে হাডুডু
মুহররম, ঈদ-উৎসব, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বিশেষ উপলক্ষেই হাডুডু প্রতিযোগিতার আয়োজন হত। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ১০০ বছরেরও বেশি ধরে প্রতি বছর হাডুডুর বিশাল আসর বসে, হাজার হাজার দর্শক আসেন।
আরও: পালকি
শারীরিক উপকারিতা
হাডুডু খেলোয়াড়ের পুরো শরীরকে সচল রাখে। ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ে, পেশিশক্তি বৃদ্ধি পায়, রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। উপস্থিত বুদ্ধি, ক্ষিপ্রতা, শক্তি, সাহস, দম, সবগুলো একসাথে কাজ করে এই খেলায়। এই কারণেই এটাকে একসময় কৃষকের শরীর চর্চার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম বলা হত।
বর্তমান অবস্থা
হাডুডুর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ক্রিকেট বা ফুটবল নয়, প্রতিপক্ষ হলো মোবাইল স্ক্রিন। আগে বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলা ছাড়া কোনো বিনোদন ছিল না। এখন ঘরে বসেই ভিডিও গেম, ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া। সেই মাঠে যাওয়ার অভ্যাসটাই কমে গেছে।
তার উপর শহরে খোলা মাঠ নেই। হাডুডুর জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা দরকার, যেটা এখন বাস্তবে পাওয়াই কঠিন। গ্রামেও জমি কমেছে, ভবন উঠেছে, খোলা মাঠ সংকুচিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে কাবাডির অবস্থান বরং ভালো। এশিয়ান গেমসে নিয়মিত প্রতিযোগিতা হচ্ছে। ভারতে প্রো কাবাডি লিগ বিশাল দর্শক পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামে যে হাডুডু খেলার ঐতিহ্য ছিল, সেটা দিন দিন সরে যাচ্ছে।
মুক্তাগাছার আসর, কিছু জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা, এবং স্কুলে বিক্ষিপ্ত আয়োজন, এটুকুই টিকে আছে। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয় খেলার প্রকৃত পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত অনুশীলন না হলে হাডুডু একদিন সত্যিই শুধু পাঠ্যবইয়ের নাম হয়ে যাবে।
আরও: হারিকেন (বাতি)
কাবাডি নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
হাডুডু আর কাবাডি কি একই খেলা?
মূলত একই খেলা, তবে হাডুডু হলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক নাম আর কাবাডি হলো আন্তর্জাতিক নাম। হাডুডু খেলায় কোনো নির্দিষ্ট বিধি ছিল না, বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নিয়মে খেলা হত। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর হাডুডুকে “কাবাডি” নামে জাতীয় খেলার মর্যাদা দিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন প্রণয়ন করা হয়।
এই খেলায় “দম” ধরার বিষয়টা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
“দম” হলো হাডুডু/কাবাডির মূল কৌশল। আক্রমণকারী (রেইডার) বিপক্ষের কোর্টে ঢুকলে এক নিঃশ্বাসে “হা-ডু-ডু-ডু” বলতে থাকেন, এটাই প্রমাণ করে তিনি নিঃশ্বাস নেননি। নিঃশ্বাস নিলে দম ফুরিয়েছে ধরা হয় এবং তিনি আউট। দম যত দীর্ঘ হবে, বিপক্ষের কোর্টে তত বেশি সময় থেকে বেশি খেলোয়াড়কে ছোঁয়া যাবে। তাই ফুসফুসের শক্তি ও নিয়ন্ত্রণ এই খেলার মূল দক্ষতা।
হাডুডু কেন বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হলো?
সরকারি কোনো দলিলে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, এমনকি বাংলাপিডিয়াতেও উল্লেখ নেই। তবে দুটি কারণ মনে করা হয়। প্রথমত, উনিশ শতকের গ্রামবাংলায় হাডুডু ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগত খেলা, আর্থিক সম্পদ বা বিশেষ সরঞ্জাম ছাড়াই খেলা যেত। দ্বিতীয়ত, ১৯৭২ সালে নবগঠিত বাংলাদেশে নিজস্ব পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে একটি দেশীয় খেলাকে জাতীয় মর্যাদা দেওয়া ছিল প্রতীকী সিদ্ধান্ত।
এখন কোথায় হাডুডু খেলা হয়?
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ১০০ বছরের বেশি ধরে প্রতিবছর বিশাল হাডুডু আসর বসে, এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো নিয়মিত হাডুডু প্রতিযোগিতা। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় প্রতিযোগিতা হয়। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশন টুর্নামেন্ট পরিচালনা করে। আনসার, বিডিআর/বিজিবি, এবং জেলা পর্যায়েও প্রতিযোগিতা হয়। গ্রামের খোলা মাঠে অনানুষ্ঠানিকভাবে হাডুডু মাঝে মাঝে এখনো দেখা যায়।