বায়োস্কোপ (Bioscope) ছিল গ্রামবাংলার প্রথম “স্ক্রিন মিডিয়া”। টেলিভিশন নেই, ইন্টারনেট নেই, এমনকি সিনেমা হলও গ্রামে পৌঁছায়নি, সেই যুগে একটি ছোট্ট বাক্সের ছিদ্রে চোখ রেখে মানুষ দেখত দূর দেশের দৃশ্য, শুনত ছন্দের গল্প, আর মুগ্ধ হয়ে যেত।
মেলার মাঠে হঠাৎ একটা ভিড় জমে যেত। মাঝখানে একটা লোক, মাথায় লাল-নীল রঙের ছোট বাক্স, পোশাকে রঙের ছড়াছড়ি, হাতে করতাল, পায়ে ঘুঙুর। গলা ছেড়ে ডাকতেন, “আসেন আসেন, দেখেন আসেন, জাদুর বাক্সে পৃথিবী দেখেন!” সেই ডাকে দৌড়ে আসত বাচ্চার দল, মাঝবয়সীরাও পিছিয়ে থাকতেন না।
আরও: লাটিম
সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বাংলা নাম | বায়োস্কোপ, বাইস্কোপ |
| ইংরেজি নাম | Peephole Box / Bioscope |
| উপাদান | কাঠ বা টিন, আতশি কাচ |
| জানালার সংখ্যা | ৪, ৬ বা ৮টি গোল ছিদ্র |
| একসাথে দর্শক | ৬–৮ জন |
| প্রতি শোর দৈর্ঘ্য | ~২ মিনিট (১০–১২ ছবি) |
| বাংলায় শুরু | ১৮৯৮ সাল (হীরালাল সেন) |
| পেশাদার নাম | বায়োস্কোপওয়ালা |
| বর্তমান অবস্থা | প্রায় বিলুপ্ত |
ইতিহাস ও উৎপত্তি
“বায়োস্কোপ” শব্দটি ইংরেজি Bioscope থেকে এসেছে, যার শাব্দিক অর্থ চলচ্চিত্র বা জীবনদর্শন (bios = জীবন, scope = দেখা)। সেলুলয়েড ফিল্ম আবিষ্কারের পরবর্তী সময়টাই ছিল বায়োস্কোপের স্বর্ণযুগ।
ইতিহাস বলে, ১৮৯৬ সালে বিদেশি উদ্যোক্তা স্টিফেন্স একটি থিয়েটার দলের সাথে কলকাতায় এসে বায়োস্কোপ প্রদর্শন করেন, এটাই ভারতীয় উপমহাদেশে বায়োস্কোপের প্রথম প্রদর্শনী। এর উদ্দীপনায় মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন ১৮৯৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে সারা দেশে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেন। সেই থেকে “গ্রামবাংলার সিনেমা হল” নামে পরিচিত হয়ে যায় এই বাক্স।
শুধু গ্রামে নয়, শহরেও বায়োস্কোপের কদর ছিল। পুরান ঢাকার নওয়াব বাড়িতে নিয়মিত বায়োস্কোপের আসর বসত বলে জানা যায়। ঢাকার অভিজাত মহলেও এটা ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম।
- বাংলায় প্রথম প্রদর্শন: ১৮৯৬ সাল
- বাণিজ্যিক শুরু: ১৮৯৮ সাল
- প্রতি শো দৈর্ঘ্য: ~২ মিনিট
- ছবির সংখ্যা প্রতি শোতে: ১০–১২টি
আরও: হাল বা লাঙল
বাক্সের গঠন
বায়োস্কোপের বাক্স দেখতে সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে আছে অপটিক্সের চমৎকার প্রয়োগ। ছোট চার কোণা কাঠ বা টিনের বাক্সের তিন দিকে থাকত ৪, ৬ বা ৮টি ছোট গোল ছিদ্র, প্রতিটিতে লাগানো আতশি কাচ (ম্যাগনিফাইং গ্লাস)। এই কাচের কারণে ভেতরের ছোট ছবিগুলো দর্শকের চোখে অনেক বড় আর কাছের দেখাত।
বাক্সের ভেতরে থাকত একটি চাকা বা রিল, যেখানে সারিবদ্ধ স্থির ছবি আটকানো থাকত। প্রদর্শক ডান হাতে রিলের চাবি ঘুরিয়ে একটার পর একটা ছবি পালটাতেন, আর বাঁ হাতে করতাল বাজিয়ে ছন্দ ধরে রাখতেন। বাক্সের ভেতর আলো ঢোকার ব্যবস্থা ছিল যাতে ছবি স্পষ্ট দেখা যায়।
বায়োস্কোপওয়ালার গান
বায়োস্কোপওয়ালার ছড়া
“কী চমৎকার দেখা গেল এইবারেতে আইসা গেল,
ঢাকার শহর দেখেন ভালো, কী চমৎকার দেখা গেল।
সুন্দরবনের বাঘ-ভালুক সামনে আছে, ডানে-বামে নজর করো,
নবাবেরই বাড়ি আছে, হাজার দুয়ারি ঘর আছে,
এইবারেতে দেখেন ভালো, আরও কিছু রইয়া গেল…”
বায়োস্কোপওয়ালার আসল শিল্প ছিল তাঁর গলায়। শুধু ছবি দেখানো নয়, প্রতিটি ছবির সাথে ছন্দে ছন্দে বিবরণ দেওয়া, দর্শকের মনে কৌতূহল তৈরি করা, হাসানো-কাঁদানো, এই পুরো পারফরম্যান্সটাই ছিল বায়োস্কোপের প্রাণ। একজন দক্ষ বায়োস্কোপওয়ালা সারাদিনে ১০০টি দল দেখালেও প্রতিবারই নতুন উদ্যমে গান গাইতেন।
তাঁদের পোশাক ছিল রঙিন, আচরণ ছিল উৎসবমুখর। হাঁটতে হাঁটতে গান গাইতেন, খঞ্জনি বা করতালের শব্দে মানুষকে আকৃষ্ট করতেন, পেছনে পেছনে ঘুরত একদল ছেলেমেয়ে। এই ভ্রাম্যমাণ পারফরমারই ছিলেন বায়োস্কোপের মূল শিল্পী।
আরও: পালকি
গ্রামীণ জীবনে বায়োস্কোপের ভূমিকা
| উপলক্ষ | দর্শক | পারিশ্রমিক |
|---|---|---|
| বৈশাখী মেলা | সব বয়সের | পয়সা বা চাল |
| দুর্গাপূজা / ঈদ মেলা | শিশু-কিশোর বেশি | পয়সা |
| সাপ্তাহিক হাট | কৃষক ও বণিক | পয়সা |
| স্কুল প্রাঙ্গণ | ছাত্র | পয়সা |
| নওয়াব বাড়ি / জমিদারি | সম্ভ্রান্ত পরিবার | নির্দিষ্ট সম্মানী |
বায়োস্কোপওয়ালার জীবন ও জীবিকা
বায়োস্কোপওয়ালারা ছিলেন একটি বিশেষ পেশাজীবী শ্রেণি। বংশপরম্পরায় এই পেশা চলত, বাবার কাছ থেকে ছেলে শিখত ছন্দ তৈরি করতে, গান বাঁধতে, বাক্স মেরামত করতে। একটি পরিবারের একাধিক সদস্য বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বায়োস্কোপ দেখাতেন।
সারা বছর মেলা-উৎসব ছিল না, তাই বায়োস্কোপওয়ালারা মৌসুমী পেশার পাশাপাশি কৃষিকাজ বা অন্য উপার্জনও করতেন। যে বায়োস্কোপওয়ালা যত ভালো গান গাইতেন, যার ছবির সংগ্রহ যত সমৃদ্ধ, তার কদর তত বেশি।
বর্তমান অবস্থা
বায়োস্কোপের পতন হয়েছে ধাপে ধাপে। ১৯৪০-৫০-এর দশকে ঢাকা-চট্টগ্রামে সিনেমা হল গড়ে উঠলে শহরের মানুষ বায়োস্কোপ থেকে মুখ ফেরাল। কিন্তু গ্রামে তখনও বায়োস্কোপই ছিল একমাত্র ভরসা। ১৯৮০-র দশকে ভিডিও ক্যাসেট এলো, গ্রামের চায়ের দোকানে টিভিতে সিনেমা দেখানো শুরু হলো। তারপর ১৯৯০-এ স্যাটেলাইট টিভি, ২০০০-এর পরে ইন্টারনেট, এবং স্মার্টফোন। প্রতিটি নতুন মাধ্যম বায়োস্কোপের দর্শক কমিয়ে দিল।
আজকের বাংলাদেশে বায়োস্কোপ কার্যত বিলুপ্ত। তবে একদম শেষ হয়নি। ময়মনসিংহের জয়নুল উৎসব, ঢাকার লোকজ মেলা, বৈশাখী মেলায় মাঝে মাঝে একজন-দুজন বায়োস্কোপওয়ালাকে দেখা যায়, বাক্স কাঁধে, গলায় পুরনো ছন্দ।
জলিল মণ্ডলের মতো কেউ কেউ বংশগত এই পেশা ছাড়েননি। তিনি এখন বেশিরভাগ সময় কৃষিকাজ করেন, উৎসবের ডাক পেলে বাক্স কাঁধে নিয়ে ছোটেন। তাঁর বায়োস্কোপে একসাথে ছয়জন দর্শক দেখতে পারেন। প্রতিটি শো-তে দেখানো হয় সুন্দরবনের বাঘ, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, তাজমহল, স্থির ছবিগুলো ছন্দে জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর কণ্ঠে।
বায়োস্কোপ আমাদের মিডিয়া ইতিহাসের একটা অমূল্য অধ্যায়। স্মার্টফোনে ইউটিউব দেখার আগে এই দেশের মানুষ বিশ্বকে প্রথম চিনেছিল একটি কাঠের বাক্সের আতশি কাচে চোখ রেখে।
আরও: হারিকেন (বাতি)
বায়োস্কোপ নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
বায়োস্কোপে কীভাবে ছবি নড়াচড়া করত?
আসলে বায়োস্কোপের ছবি নড়ত না, ছবিগুলো সব স্থির ছিল। প্রদর্শক একটার পর একটা ছবি দ্রুত পালটাতেন। এই দ্রুত পরিবর্তন এবং সাথে ছন্দময় বর্ণনা, গান আর শব্দ মিলে দর্শকের মনে ছবি “জীবন্ত” মনে হত। এটা অনেকটা আজকের flip book animation-এর মতো নীতি, যদিও বায়োস্কোপে ছবি পালটানোর গতি তত বেশি ছিল না। মূল যাদু ছিল প্রদর্শকের কণ্ঠে।
হীরালাল সেন কে ছিলেন?
হীরালাল সেন ছিলেন মানিকগঞ্জের একজন অগ্রণী চলচ্চিত্র উদ্যোক্তা। ১৮৯৮ সালে তিনি বাণিজ্যিকভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বায়োস্কোপ দেখানো শুরু করেন। তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের একজন পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্টিফেন্সের অনুপ্রেরণায় তিনি এই শিল্পে প্রবেশ করেন এবং গ্রামীণ বাংলায় বায়োস্কোপ ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বায়োস্কোপ দেখতে কত টাকা লাগত?
বায়োস্কোপ দেখার জন্য খুব সামান্য পারিশ্রমিক নেওয়া হত, সাধারণত ২-৫ পয়সা। অনেক সময় নগদ পয়সার বদলে চালও নেওয়া হত। এই সহজলভ্য মূল্যের কারণেই বায়োস্কোপ সত্যিকারের গণমাধ্যম হয়ে উঠেছিল, সমাজের সব শ্রেণির মানুষ দেখতে পারত।
বায়োস্কোপ ও সিনেমার মধ্যে পার্থক্য কী?
বায়োস্কোপে স্থির ছবি দেখানো হত একে একে, সাথে প্রদর্শকের মুখের গান-বর্ণনা ছিল জীবন্ত করার মাধ্যম। একসাথে মাত্র ৬-৮ জন দেখতে পারতেন। সিনেমায় প্রকৃতপক্ষে চলমান ছবি দেখানো হয়, একটি প্রজেক্টর দিয়ে পর্দায় ছবি ফেলা হয়, একসাথে শত শত দর্শক দেখতে পারেন। বায়োস্কোপ ছিল সিনেমার পূর্বসূরি, প্রযুক্তিগতভাবে ভিন্ন, কিন্তু মানুষের কল্পনার জগত খুলে দেওয়ার কাজটা একইভাবে করেছিল।