খড়ম (Paduka) ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো পাদুকা। চামড়ার জুতা আসার আগে, রাবারের স্যান্ডেল আসার অনেক আগে, কাঠের এই সরল পাদুকাই ছিল বাংলার মানুষের পায়ের একমাত্র সঙ্গী।
একটু কান পাতলেই একসময় শোনা যেত সেই চেনা শব্দ, “ঠক ঠক ঠক”। গৃহস্থরা শুনেই বুঝতেন, বাড়িতে কেউ আসছেন। সেই শব্দ খড়মের। কাঠের সেই ছোট পাদুকাটি পায়ে দিয়ে হাঁটলে যে শব্দ হত, সেটাই ছিল একধরনের পরিচয়পত্র, বলে দিত আসছেন বাড়ির মুরুব্বি, মসজিদফেরত হুজুর, কিংবা পাড়ার সম্মানিত কেউ।
আরও: ঢেঁকি
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বাংলা নাম | খড়ম |
| সংস্কৃত নাম | পাদুকা |
| হিন্দি উৎস | খড়ৌঙ (Kharaun) |
| ইংরেজি নাম | Wooden Sandal / Clog |
| উপাদান | কাঠ (নিম, তেঁতুল, বেল) |
| বিশেষ অংশ | গোল গুটি (পায়ের আঙুল আঁকড়ায়) |
| ব্যবহারকাল | প্রাচীনকাল – ১৯৮০ দশক |
| বর্তমান অবস্থা | প্রায় বিলুপ্ত |
| প্রচলন | ধর্মীয়, গৃহস্থালি, আভিজাত্য |
নাম ও উৎপত্তি
“খড়ম” শব্দটি এসেছে হিন্দি “খড়ৌঙ” থেকে। সংস্কৃতে এর নাম “পাদুকা”, অর্থাৎ পায়ে দেওয়ার বস্তু। ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে বিভিন্ন নামে এই কাঠের পাদুকার প্রচলন ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো খড়ম পাওয়া গেছে আমেরিকার ওরেগনে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ থেকে ৮০০০ বছর আগের। এটা প্রমাণ করে, কাঠ দিয়ে পা রক্ষার ধারণাটা মানুষ সভ্যতার একদম শুরু থেকেই রপ্ত করেছিল।
ভারতবর্ষে ১৭০০ শতকের দিকে কাঠের খড়ম অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তবে বাংলায় এর ব্যবহার আরো প্রাচীন। রামায়ণে খড়মের উল্লেখ আছে, যেখানে রামচন্দ্র বনবাসে গেলে ভাই ভরত রামের খড়ম সিংহাসনে বসিয়ে রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন, প্রতীকী রাজত্বের চিহ্ন হিসেবে।
আরও: গরুর গাড়ি
শাহজালালের খড়ম
১৩০৩ সালে হযরত শাহজালাল (রহ.) তুরস্ক থেকে সিলেটে আসেন খড়ম পায়ে দিয়ে। তাঁর ব্যবহৃত সেই খড়ম আজও সিলেটের দরগাহ মহল্লায় সংরক্ষিত আছে, সাত শতাধিক বছর পরেও। এটি বাংলাদেশে খড়মের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক নিদর্শন।
গঠন
খড়মের গঠন দেখতে যতটা সরল, এর পেছনে আছে হাজার বছরের নকশা-জ্ঞান। একখণ্ড শক্ত কাঠ পায়ের মাপে কেটে মসৃণ করা হয়। সামনের দিকে, ঠিক বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পাশের আঙুলের মাঝামাঝি জায়গায় – একটি ছোট গোলাকার কাঠের গুটি বসানো হয়। এই গুটিটাই খড়মকে পায়ে ধরে রাখে। হাঁটার সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে গুটি আঁকড়ে ধরে চলতে হয়।
নিম, তেঁতুল, বেল বা শিশু গাছের হালকা কিন্তু শক্ত কাঠ খড়ম বানানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কারিগররা (মূলত ছুতার মিস্ত্রি) ধারালো বাটাল দিয়ে কাঠ কেটে পায়ের আকৃতি দিতেন, তারপর হাতুড়ি দিয়ে গুটি ঢুকিয়ে দিতেন। অভিজাত পরিবারের খড়মে কখনো কখনো রঙ বা বার্নিশও করা হত।
আরও: পালকি
ব্যবহার
| ব্যবহারকারী | কোন সময় | খড়মের ধরন |
|---|---|---|
| সাধারণ গ্রামবাসী | পুকুর ঘাটে, বাড়িতে | সাধারণ, অলঙ্কারহীন |
| আলেম / হুজুর | অজুর পর মসজিদে যেতে | সরল, পরিচ্ছন্ন |
| জমিদার / সম্ভ্রান্ত | ঘরে ও দরবারে | বার্নিশ করা, কারুকাজ সহ |
| হিন্দু পুরোহিত | পূজায়, মন্দিরে | পাদুকা পূজায় ব্যবহৃত |
| সাধু / দরবেশ | সব সময় | সরল, কখনো একার কাঠে খোদাই |
খড়ম ও ধর্মীয় জীবন
বাংলাদেশে খড়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ছিল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। মুসলমান পরিবারে অজু করার পর পুকুর ঘাট থেকে উঠে মসজিদে যাওয়ার সময় খড়ম পায়ে দেওয়া ছিল নিয়মের মতো। কাদা-পানিতে পা না ভিজিয়ে পবিত্র অবস্থায় নামাজে যাওয়ার এই ব্যবস্থাপনাটা ছিল যতটা ধর্মীয়, ততটাই ব্যবহারিক।
হিন্দু সমাজে খড়মের তাৎপর্য আরো গভীর। সাধু-সন্ন্যাসী থেকে দেবতার পাদুকা পর্যন্ত, খড়ম ছিল পবিত্রতা ও সম্মানের প্রতীক। “পাদুকা পূজা” নামে একটি ধর্মীয় রীতিও প্রচলিত ছিল, যেখানে গুরু বা দেবতার খড়মকে সাক্ষাৎ তাঁর প্রতিনিধি মনে করে পূজা করা হত।
“কিছুকাল আগেও খড়মের শব্দে গৃহস্থরা বুঝতে পারতেন তাদের বাড়িতে কেউ আসছেন।” — প্রবীণ গ্রামবাসী, রংপুর
পরিবেশবান্ধব পাদুকা
আধুনিক পরিবেশ-সচেতনতার দৃষ্টিতে খড়ম হলো আদর্শ পাদুকা। কাঠ, নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। কোনো প্লাস্টিক নেই, কোনো রাসায়নিক নেই। নষ্ট হলে মাটিতে মিশে যায়। পায়ের তলার সাথে ঘষা না খাওয়ায় বয়রা (callus) রোগ হয় না। বরং কাঠের উপর পা রাখা পায়ের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বলে আধুনিক পডিয়াট্রিস্টরাও মত দেন।
আরও: হারিকেন (বাতি)
বর্তমান অবস্থা
আজকের বাংলাদেশে খড়ম কার্যত বিলুপ্ত। রংপুরের মিঠাপুকুর শঠিবাড়িতে একটিমাত্র ছোট কারখানায় এখনো খড়ম তৈরি হয়। রংপুর শহরের আমাশু বাজারে একটি দোকানে মাসে ২০–৩০ জোড়া বিক্রি হয়, বেশিরভাগ ক্রেতা প্রবীণ বা ধর্মীয় কারণে যারা খড়ম ব্যবহার করেন।
সিলেটের শাহজালালের দরগায় খড়ম এখনো বিশেষ সম্মানের বস্তু। দরগা-সংলগ্ন দোকানে খড়ম বিক্রি হয়, পুণ্যার্থীরা কিনে নিয়ে যান স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। এছাড়া কিছু মন্দির ও আশ্রমে এখনো পাদুকা হিসেবে খড়মের ব্যবহার আছে।
সারা দেশে যে কয়েকজন কারিগর খড়ম বানানোর পেশা ধরে রেখেছেন, তারাই এখন এই ঐতিহ্যের শেষ রক্ষক।
খড়ম নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
হযরত শাহজালালের খড়ম কি এখনো দেখা যায়?
হ্যাঁ। হযরত শাহজালাল (রহ.) ১৩০৩ সালে সিলেটে আসার সময় যে খড়ম ব্যবহার করতেন, তা সিলেটের দরগাহ সংলগ্ন স্থাপনায় সুরক্ষিত রাখা আছে বলে লোকমুখে প্রচলিত এবং ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে। সিলেটের দরগা মহল্লায় মুফতি নাজমুদ্দিন আহমদের পারিবারিক তত্ত্বাবধানে এই খড়ম ও তলোয়ার সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়।
খড়ম পরা কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?
চিকিৎসকরা মনে করেন, খড়মের শক্ত কাঠের তলা পায়ের তলদেশকে স্বাভাবিক রাখে, বয়রা বা callus হয় না। আধুনিক নরম রাবার-প্লাস্টিকের স্যান্ডেলে ঘর্ষণ বেশি বলে বয়রা রোগ বাড়ছে। তবে খড়ম পরে বেশিক্ষণ হাঁটলে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে চাপ পড়ে, এটা অভ্যাসের বিষয়। কাঠ প্রাকৃতিক তাপ নিরোধক বলে গরমেও পা আরামদায়ক থাকে।
রামায়ণে খড়মের কোন গল্পটি বিখ্যাত?
রামায়ণে রামচন্দ্র বনবাসে গেলে তাঁর ভাই ভরত রাজ্যের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। বরং রামের খড়ম (পাদুকা) সিংহাসনে রেখে বলেন, রাম না ফেরা পর্যন্ত এই পাদুকাই রাজা, আমি শুধু রক্ষণাবেক্ষণকারী। এই গল্পটি বড় ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের প্রতীক হয়ে গেছে। এর থেকেই হিন্দু সংস্কৃতিতে “পাদুকা পূজা”র ধারণার উৎপত্তি।
খড়ম এত সস্তা হওয়া সত্ত্বেও কেন হারিয়ে গেল?
কারণটা মূলত সামাজিক, দামের চেয়েও বেশি। আশির দশকে বার্মিজ স্যান্ডেল বাজারে এলে সেটা ছিল ৮০–১০০ টাকায়, খড়ম ছিল ১৫০–২০০ টাকায়। দামে খড়ম হেরে গেল। তার চেয়েও বড় কারণ, সামাজিক পরিবর্তন। খড়ম পায়ে দিলে “গেঁয়ো” বা “পুরনো” মনে হয়, এই মনোভাব ছড়িয়ে পড়ল। শেষমেশ ফ্যাশন আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে হেরে গেল শতাব্দী পুরনো এই পাদুকা।