নিকলী হাওর (Nikli Haor), বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম এক বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। নিকলী এক অসাধারণ জায়গা। যে দিকে তাকাবেন পানি আর পানি। ঢাকা থেকে একদিনের ভ্রমণের জন্য দারুণ এক উপভোগ্য স্থান নিকলী হাওর।
আরও: পাগলা মসজিদ
| ধরন | হাওর |
| অবস্থান | নিকলী, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ |
| আয়তন | ২১৪.৪০ বর্গ কিলোমিটার |
| ঢাকা থেকে দূরত্ব | ১১০ কিলোমিটার (প্রায়) |
| কিশোরগঞ্জ সদর থেকে দূরত্ব | ২৫ কিলোমিটার (প্রায়) |
| ড্রোন উড়ানো যাবে | হ্যাঁ |
ভ্রমণের সেরা সময়
নিকলী হাওর ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হচ্ছে বর্ষার মৌসুমে। আপনার যদি হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার ইচ্ছে থাকে তাহলে, বর্ষার সময় আসলে বেশি উপভোগ করতে পারবেন। বর্ষার সময়টাকেই ভ্রমণের আদর্শ সময় বলা হয়ে থাকে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস এর মধ্যে গেলেই দেখা পাবেন অপরূপ সৌন্দর্য এবং দিগন্ত বিস্তৃত এক নিকলী হাওর।
কি কি দেখবেন
নিকলী দেখার জন্য সবচেয়ে সেরা হচ্ছে এর বিস্তীর্ণ হাওর। হাওরের চারপাশে অথৈ পানি রয়েছে। কিছু স্থানে আপনার মনে হবে আপনি সমুদ্রের মাঝে আছেন। যে দিকে তাকাবেন মনে হবে আকাশ পানির সাথে মিশে গিয়েছে। আর, এর সাথেই মানুষের বসবাস। আপনি যদি মাঝিদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখা, হাওরের মাছ খাওয়া, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, কোথাও জেগে ওঠা চরে জলারবনের মাঝে যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চান, তাহলে নিকলী হাওর চলে আসতে পারেন।
এছাড়া রয়েছে অষ্টগ্রাম হাওর, মিঠামইন হাওর, ইটনা হাওর সহ বেশ কিছু হাওর এর দেখা পাবেন। তবে সবচেয়ে দারুন লাগবে ট্রলারে করে ঘুরে বেড়ানো আর ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়কে অটো অথবা মোটসাইকেল ভ্রমণ।
আরও: হুড়হুড়ে ফুলের দেশ
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস ভ্রমণ: আপনি ঢাকা সায়েদাবাদ অথবা গোলাপবাগ থেকে অনন্যা সুপার বাস সার্ভিসে যেতে পারেন। সুপার বাস সার্ভিস প্রতিদিন ভোর ৫:৩০ মিনিট থেকে ১৫ মিনিট পর পর বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া নিতে পারে জনপ্রতি ২৭০ থেকে ৩৫০ টাকা। এরপর, নিকলী যেতে আপনাকে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে সিএনজি রিজার্ভ করতে হবে। দূরত্ব ২২ কিলোমিটার প্রায়। আর যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা ২০ মিনিট।
বি: দ্র: একদিনের ভ্রমণের জন্য আপনাকে অবশ্যই সকাল ৭টার আগেই বাসে রওনা দিতে হবে। বাসে কিশোরগঞ্জ এর আগেই কটিয়াদি বাস স্ট্যান্ড নেমে যাবেন। ঢাকা থেকে কটিয়াদি আসতে সময় লাগবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা এর মত।
কিশোরগঞ্জ থেকে বাস ভ্রমণ: আপনি যদি কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে নিকলী ভ্রমণে যেতে চান তবে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে ষ্টেশনের সংলগ্ন নিকলীগামী সিএনজি ষ্টেশনে চলে যান। সদর থেকে নিকলী হাওর এর দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার প্রায়। লোকালে বা রিজার্ভ নিয়ে নিকলী যেতে সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা। ভাড়া নিতে পারে লোকালে যেতে জনপ্রতি ভাড়া ৭০ টাকা আর সিএনজি রিজার্ভ নিলে ভাড়া নিবে ৩৫০-৪৫০ টাকা।
ভৈরব থেকে বাস ভ্রমণ: আপনি ভৈরব থেকেও লোকাল কিংবা রিজার্ভ সিএনজি নিয়ে নিকলী যেতে পারবেন। সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট। ভাড়া নিতে পারে লোকালে যেতে জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা আর রিজার্ভ নিলে ৬০০ টাকা।
ঢাকা থেকে ট্রেন ভ্রমণ: আপনি ঢাকা থেকে ট্রেনে গিয়ে একদিনে ঘুরে দেখতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই আন্তঃনগর এগারো সিন্ধুর প্রভাতী ট্রেনে আসতে হবে। ট্রেন সময়সূচী: এগারো সিন্ধুর প্রভাতী বুধবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ৬ দিন কমলাপূর ষ্টেশন থেকে সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে বিমানবন্দর, টঙ্গী, নরসিংদী ও ভৈরব ষ্টেশন হয়ে কিশোরগঞ্জ যায়। ভাড়া নিতে পাড়ে ট্রেনের টিকেট ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
বি: দ্র: যদি ট্রেনে যান তাহলে সবচেয়ে ভাল হয় কিশোরগঞ্জ সদরে পোঁছার আগের ষ্টেশন গচিহাটা ষ্টেশনে নেমে গেলে। ঢাকা থেকে ট্রেনে রওনা দিয়ে আপনি সকাল ১১ টার মধ্যেই গচিহাটা ষ্টেশনে চলে যেতে পারবেন।
এরপর, ষ্টেশন থেকে ইজিবাইক অথবা CNG দিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন ১৫ কিলোমিটার দূরের নিকলী বাজারে। ইজিবাইকে জনপ্রতি ৩৫ টাকা অথবা রিজার্ভ নিলে ২৫০ – ৩০০ টাকা ভাড়ায় নিকলী যেতে পারবেন। সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা। সিএনজি রিজার্ভ নিলে খরচ হবে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা আর সময় লাগবে প্রায় ৪০ মিনিট।
মোটরসাইকেল: আপনি যদি মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন তাহলে ট্রলারে করে মোটরসাইকেল নিয়ে যেতে পারবেন। মোটরসাইকেল যারা নিয়ে আসেন তারা সবাই এভাবেই যায়। কিন্তু ট্রলারে করে প্রাইভেট কার নিয়ে যাওয়া তো সম্ভব না। তাই ভ্রমণের সময় এই বিষয়টা খেয়ার রাখবেন।
ট্রলার: আপনি ২ ভাবে ট্রলার ভাড়া করতে পারবেন। লোকাল ভাবে গেলে জনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ভাড়া নিবে। আর রিজার্ভ গেলে ১২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা নিবে। ট্রলারের সাইজ, কয়জন যাবেন এবং দর্শনার্থীদের চাপের উপর নির্ভর করে ভাড়া কম বেশি হয়ে থাকে। ট্রলার ভাড়া করার সময় দরদাম করে নিবেন।
আরও: শেখ মাহমুদ শাহ মসজিদ
কোথায় খাবেন
নিকলী যেখানে নামবেন সেখানেই মোটামুটি মানের কয়েকটি খাবার হোটেল আছে। হোটেল সেতু, ক্যাফে ঢেউ সহ আরও বেশ কিছু হোটেল পাবেন। হাওরের তাজা মাছের নানা পদ দিয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকায় ভরপেট খেয়ে নিতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন
আপনি নিকলীতে থাকার জন্য কোন ভালো মানের আবাসিক হোটেল পাবেন না। আগেই বলেছি এটা ডে ট্যুর এর জন্য চমৎকার। তবে যদি থাকতে হয় তাহলে, চেয়ারম্যান গেস্ট হাউজ অথবা ভালো উপজেলা ডাক বাংলো তে থাকতে পারবেন।
এছাড়া কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে গিয়ে সেখানে থাকতে পারবেন। চাইলে নৌকায় বা ক্যাম্পিং করে রাত পার করে দিতে পারবেন। তবে, নিরাপত্তার বিষয়টা সবসময় মাথায় রাখবেন। কারন, ভ্রমণে নিরাপত্তা সবার আগে।
ডে ট্রিপ প্ল্যান
ঢাকা থেকে একদিনে ভ্রমণের জন্য সকালের ট্রেনে বা সকালের কোন বাসে রওনা দিতে হবে। সেই ক্ষেত্রে সময়ের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাসে আসলে চেষ্টা করতে হবে যত ভোরে রওনা দেওয়া যায়। যত ভোরে বের হবেন তুত বেশি স্থান ঘুরে দেখতে পারেন। তবে, যে ভাবেই নিকলী আসেন না কেন, সারাদিনের ভ্রমনে শেষে আপনাকে বাসে করেই ঢাকা যেতে হবে। সেই ক্ষেত্রে নিকলী থেকে সিএনজি তে করে কটিয়াদি এসে সেখান থেকে ঢাকা যাওয়ার বাস পাবেন। কটিয়াদি থেকে ঢাকা যাওয়ার শেষ বাসের সময় সন্ধ্যা ৭টা।
আশেপাশের আরও দর্শনীয় স্থান
নিকলী হাওর এর আশেপাশে আরও বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সময় পেলে ঘুরে আসতে পারেন।
- গুরই শাহী জামে মসজিদ (রিকসা বা মটরসাইকেলে করে সহজেই ঘুরে আসতে পারেন।)
- নিকলী বেড়ি বাঁধ (নিকলী উপজেলা অফিসের সামনে থেকে বেড়িবাদ শুরু তাই পায়ে হেটে দেখা যাবে তার সৌন্দর্য।)
- পাহাড় খাঁর মাজার (নিকলী উপজেলা থেকে ট্রলারে করে ও মটর সাইকেলে করে যাওয়া যায়।)
- গুরই প্রাচীনতম আখড়া (কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলায় গুরই ইউনিয়নে এই আখড়া অবস্থিত। শুকনো মৌসুমে রিকসা, মটরসাইকেল, সিএনজি দিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু বর্ষা মৌসুমে নৌকা বা ট্রলার যোগে যেতে হয়।)
টিপস ও সতর্কতা
- যাদের পানিতে ভয় (Water Phobia) রয়েছে তারা নিকলী হাওর ভ্রমণের সময় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করুন। কারন এটা হাওর। চারপাশে শুধু পানি আর পানি।
- বর্ষার মৌসুমে প্রচুর ভ্রমণ প্রেমীরা এখানে ঘুরতে যান। ভ্রমণের আগে বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে পোশাক নিয়ে নিবেন।
- আপনি যদি মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন তাহলে ট্রলারে করে নিয়ে যেতে পারবেন। মোটরসাইকেল যারা নিয়ে আসেন তারা সবাই এভাবেই যায়। কিন্তু ট্রলারে করে প্রাইভেট কার নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই ভ্রমণের সময় প্রাইভেট কার নিয়ে আসার বিষয়টা খেয়াল রাখবেন।
- যারা সাতার পারেন না তারা লাইফ জ্যাকেট নিয়ে পানিতে নামবেন।
- যেখানে পানির গভীরতা বেশী সেখানে নামার সময় সাবধান থাকুন।
- সাথে অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে নিন।
- ট্রলার বা নৌকায় উঠার আগে হালকা খবার এবং পানি নিয়ে নিন।
- মোবাইল, মানিব্যাগ, ক্যামেরা, ড্রোন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সাবধানে রাখুন।
- নৌকায়/ট্রলার চড়ার সময় সতর্ক থাকুন।
- নিকলী হাওরের রাস্তায় অনেক মোটরসাইকেল চলে তাই, রাস্তায় দাড়িয়ে ছবি তুলার সময় সতর্ক থাকুন।
- বাচ্চাদের প্রতি অতিরিক্ত খেয়াল রাখুন।
- কারও সাথে খারাপ ব্যাবহার করবেন না।
- নৌকার উঠে লাফালাফি করবেন না।
- নৌকায় ভাড়া করার সময় দরদাম করে নিন।
- হাওরের পানি পান করবেন না।
- পানিতে মলত্যাগ করবেন না।
- সন্ধ্যার পর এখানে না থাকাই ভালো।
আরও: টাঙ্গুয়ার হাওর
নিকলী নিয়ে ভ্রমণ জিজ্ঞাসা
নিকলী হাওর কোথায় অবস্থিত?
নিকলী হাওর ঢাকা বিভাগ এর কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার অবস্থিত।
ঢাকা টু নিকলী হাওর কত কিলোমিটার?
১১০ কিলোমিটার (প্রায়)
মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়া যাবে?
হ্যাঁ
প্রাইভেট কার বা বড় গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে?
না। আপনাকে গাড়ি রেখে যেতে হবে।
ফেসবুক: GoArif
